নিম্ন আদালতের রায় খারিজ
আইনি সম্মতি ও বৈবাহিক অধিকারের পরিধি নির্ধারণে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করল ত্রিপুরা হাইকোর্ট। আদালতের একটি ডিভিশন বেঞ্চ, যার মধ্যে ছিলেন বিচারপতি ড. টি. অমরনাথ গৌড় এবং বিচারপতি এস. দত্ত পুরকায়স্থ, নিম্ন আদালতের দেওয়া ১০ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড এবং ১ লক্ষ টাকা জরিমানার আদেশ সম্পূর্ণ বাতিল করে দিয়েছে। এর ফলে সাজাপ্রাপ্ত আপিলকারী সুকান্ত মুরাসিং সমস্ত অভিযোগ থেকে বেকসুর খালাস পেয়েছেন। দক্ষিণ ত্রিপুরার বিলোনিয়ার অতিরিক্ত দায়রা আদালত এই সাজা শুনিয়েছিল।
হাইকোর্ট পর্যবেক্ষণ করেছে যে, প্রসিকিউশন বা সরকারের পক্ষ সুকান্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলি কোনো রকম সন্দেহাতীত প্রমাণ করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, ভারতীয় দণ্ডবিধির (IPC) ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, একটি আইনসম্মত বিবাহ বহাল থাকাকালীন স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা শারীরিক সম্পর্ককে কোনোভাবেই ধর্ষণের তকমা দেওয়া যায় can না।
মামলার প্রেক্ষাপট ও সামাজিক বিরোধ
এই মামলার সূত্রপাত হয়েছিল ২০২২ সালে দায়ের করা একটি এফআইআর (FIR)-এর মাধ্যমে। অভিযোগকারী নারী দাবি করেছিলেন যে, সুকান্ত মুরাসিং ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তাঁর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন করেছিলেন এবং পরে বিয়ের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তবে মামলার নথি এবং শুনানিতে অন্য তথ্য সামনে আসে:
- প্রেমের সম্পর্ক ও আইনি বিয়ে: ২০১৩ সাল থেকেই তাঁদের মধ্যে গভীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল, যা পরবর্তীতে শারীরিক সম্পর্কে রূপ নেয়। ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে তাঁরা দুজনে একটি নোটারী ঘোষণার মাধ্যমে আইনত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন এবং দীর্ঘ কয়েক বছর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একসঙ্গে বসবাস করেন।
- সামাজিক বিয়ের বিতর্ক: সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয় ২০২২ সালের মার্চ মাস থেকে। অভিযোগকারী নারী ও তাঁর পরিবার সুকান্তকে সামাজিকভাবে অনুষ্ঠান করে বিয়ে করার জন্য চাপ দিতে থাকেন। সুকান্ত সেই সামাজিক বিয়ে করতে কিছুটা সময় চাইলে বা অস্বীকৃতি জানালে, বিষয়টি প্রথমে গ্রামের প্রধানদের কাছে যায় এবং পরে তা ফৌজদারি মামলায় রূপ নেয়।
সম্মতি নিয়ে হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ
আপিল শুনানির সময় হাইকোর্ট লক্ষ্য করে যে, কোনো মেডিকেল রিপোর্ট বা সাক্ষ্যপ্রমাণ জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্কের তত্ত্বকে সমর্থন করছে না। অভিযোগকারী নারী নিজেই আদালতে স্বীকার করেছেন যে, তিনি প্রাপ্তবয়স্ক এবং নিজের সিদ্ধান্তের ফলাফল বোঝার মতো যথেষ্ট পরিপক্ক ছিলেন। দীর্ঘ কয়েক বছর একসঙ্গে সংসার করার সময় তিনি কোনো দিন কোনো থানায় বা কারও কাছে এই নিয়ে অভিযোগ জানাননি। সবচেয়ে বড় বিষয়, সুকান্তের সাথে তাঁর আইনি বিয়ে আজও টিকে রয়েছে।
আদালত চূড়ান্ত রায়ে জানায়, এই মামলাটি আসলে সামাজিক বিয়ের দাবি পূরণ না হওয়ায় ব্যক্তিগত সম্পর্ক তিক্ত হওয়ার বহিঃপ্রকাশ, এটি কোনো দণ্ডনীয় অপরাধ নয়। এর পরেই হাইকোর্ট সুকান্ত মুরাসিং-কে অবিলম্বে কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়ার নির্দেশ জারি করে।

