জেনেভা — ২০১৪ সালে পশ্চিম আফ্রিকায় ইবোলার ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব এবং পরবর্তীকালে কোভিড-১৯-এর বৈশ্বিক বিপর্যয় থেকে কঠিন শিক্ষা নেওয়া সত্ত্বেও, একটি নতুন চাঞ্চল্যকর রিপোর্টে সতর্ক করা হয়েছে যে পৃথিবী পরবর্তী মহামারীর মোকাবিলা করার জন্য অত্যন্ত বিপজ্জনকভাবে অপ্রস্তুত রয়ে গেছে।
এই সতর্কতা এসেছে গ্লোবাল প্রিপেয়ার্ডনেস মনিটরিং বোর্ড (GPMB)-এর পক্ষ থেকে—যা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিশ্বব্যাংক দ্বারা ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি স্বাধীন জবাবদিহিতা সংস্থা। ২০২৬ সালের মে মাসের মাঝামাঝি সময়ে প্রকাশিত এই রিপোর্টের শিরোনাম ছিল: “সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে বিশ্ব: মহামারী-প্রতিরোধী ভবিষ্যতের অগ্রাধিকার” (A World on the Edge: Priorities for a Pandemic-Resilient Future)। এই রিপোর্টটি একটি কঠোর সত্য সামনে এনেছে যে, সংক্রামক রোগের ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির তুলনায় বিশ্বব্যাপী মহামারীর প্রস্তুতির জন্য আর্থিক বিনিয়োগ অত্যন্ত নগণ্য।
এই রিপোর্টটি এমন এক সময়ে প্রকাশ পেয়েছে যখন আফ্রিকা মহাদেশে আরেকটি নতুন স্বাস্থ্য সংকট তৈরি হয়েছে। ১৭ মে ২০২৬ তারিখে, ডব্লিউএইচও (WHO) আনুষ্ঠানিকভাবে ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গো (DRC)-তে ছড়িয়ে পড়া নতুন ইবোলা প্রাদুর্ভাবকে ‘আন্তর্জাতিক উদ্বেগের জনস্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা’ (PHEIC) হিসেবে ঘোষণা করেছে। এর অর্থ হলো, এই রোগটি আন্তর্জাতিকভাবে ছড়িয়ে পড়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে, যার জন্য অবিলম্বে সমন্বিত বৈশ্বিক প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
নীতিগত দুর্বলতা: সতর্কবার্তায় অবহেলা
GPMB বিশ্বমানের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে নিখুঁত ঝুঁকি মূল্যায়ন করলেও, এর গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশগুলো অনেক দেশই কার্যকর করেনি। এই নীতিগত ব্যর্থতার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হচ্ছে আফ্রিকা মহাদেশে, যেখানে প্রায়শই বিভিন্ন মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি হানা দেয় এবং সাধারণ মানুষকে বিপন্ন করে তোলে।
ভাইরাস বিশেষজ্ঞ এবং জনস্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মতে, এই চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে হলে আফ্রিকাকে মহামারী প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে নিজস্ব অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ওপর আস্থা তৈরি করতে হবে। এই লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য, মহাদেশটিকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভের ওপর ভিত্তি করে তৈরি কৌশলকে শক্তিশালী করতে হবে:
তথ্য সার্বভৌমত্ব (Data Sovereignty) এবং স্বাধীন ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ
আফ্রিকান দেশগুলোকে নিজস্ব স্থানীয় অর্থায়নে এমন ডেটা সিস্টেম তৈরি করতে হবে যা তাদের জাতীয় স্বাস্থ্য সার্বভৌমত্বকে রক্ষা করে। বর্তমানে, কিছু বিতর্কিত আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর চাপ সৃষ্টি করে, যার ফলে তারা বিদেশি ফান্ডের বিনিময়ে তাদের মূল্যবান স্বাস্থ্য তথ্য (Health Data) অথবা গুরুত্বপূর্ণ প্যাথোজেন বা জীবাণু বিদেশি সংস্থাগুলোর হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।
এর পরিবর্তে, স্বাস্থ্য তথ্যকে একটি অমূল্য জাতীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, যা জনস্বাস্থ্যের নজরদারি, চিকিৎসাগত ব্যবস্থাপনা এবং নিজস্ব ভ্যাকসিন গবেষণার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- স্থানীয় উদ্ভাবন: বৈশ্বিক কল্যাণের উদ্দেশ্যে নিজেদের প্রাকৃতিক জীবাণু থেকে ওষুধ ও প্রতিষেধক তৈরি করতে স্থানীয় বিজ্ঞানীদের প্রয়োজনীয় ফান্ডের জোগান দিতে হবে এবং উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
- সমন্বিত নজরদারি: ডব্লিউএইচओ-আফ্রিকা অঞ্চল (WHO-Africa Region) এবং আফ্রিকা সেন্টার ফর ডিজিজ কন্ট্রোল (Africa CDC)-এর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিযোগিতা বন্ধ করে, একটি কেন্দ্রীয় সেন্ট্রালাইজড ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে যৌথভাবে কাজ করা উচিত।
স্বাস্থ্যকর্মীদের ধরে রাখা (Workforce Retention)
সাধারণত বিশ্বব্যাপী ফান্ডের একটি বড় অংশ স্বল্পমেয়াদী “দক্ষতা বৃদ্ধি” (capacity building) কর্মশালার পেছনে ব্যয় করা হয়, অথচ আফ্রিকার স্বাস্থ্য ব্যবস্থাগুলো দক্ষ কর্মীদের ধরে রাখার (Workforce Retention) সমস্যায় জর্জরিত। মেধাপাচার (brain drain) রোধ করতে এবং কাজের মান বাড়াতে আফ্রিকান দেশগুলোকে একটি নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করতে হবে।
এর জন্য মানসিক নিরাপত্তার পাশাপাশি ল্যাবরেটরিতে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো—যেমন আধুনিক সরঞ্জাম, রিএজেন্ট, ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (PPE) এবং চিকিৎসা সামগ্রী নিশ্চিত করা অত্যন্ত প্রয়োজন। উপযুক্ত পরিবেশ পেলে স্থানীয় কর্মীরা দেশীয় স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো নিয়ে আরও কার্যকরভাবে গবেষণা করতে পারবেন।
প্রতিষেধক ও চিকিৎসার সমান অধিকার (Equitable Access)
আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য চুক্তিগুলোর আলোচনার টেবিলে আফ্রিকাকে দৃঢ় অবস্থান নিতে হবে। বৈশ্বিক স্বাস্থ্য চুক্তির সময় মহাদেশটির স্বার্থের সাথে আপস করা চলবে না এবং নিচের বিষয়গুলোর স্পষ্ট গ্যারান্টি দাবি করতে হবে:
- প্রযুক্তির সঠিক ও সহজ হস্তান্তর (Technology Transfer)
- জরুরি স্বাস্থ্য সংকটের সময়ে মেধা স্বত্ব (IP) বা প্যাটেন্ট মকুবের অধিকার
- আঞ্চলিক স্তরে ওষুধ ও ভ্যাকসিনের শক্তিশালী উৎপাদন পরিকাঠামো
ডায়াগনস্টিক কিট, সিরিঞ্জ, গ্লাভস, মাস্ক এবং ভ্যাকসিনের স্থানীয় উৎপাদন বাড়িয়ে আফ্রিকান দেশগুলো বৈশ্বিক সংকটের সময়ে সাপ্লাই চেইন ভেঙে পড়া এবং ভ্যাকসিনের বৈষম্যমূলক বণ্টন থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে, যা কোভিড-১৯ মহামারীর সময়ে দেখা গিয়েছিল।
টেকসই অর্থায়ন এবং আফ্রিকান এপিডেমিক ফান্ড (African Epidemic Fund)
ঐতিহাসিকভাবে, আফ্রিকার স্বাস্থ্য খাতে সবচেয়ে বড় আর্থিক বাধা কেবল পুঁজির অভাব নয়, বরং উপলব্ধ সংস্থান বা ফান্ডের টাকা ভুল রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অপচয় করা।
এই অবস্থার পরিবর্তনের জন্য, সরকারকে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ক্ষেত্রের অংশীদারিত্বে (Blended Financing) স্বাস্থ্য খাতে নিজস্ব বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এই ভাবনার একটি বাস্তব উদাহরণ হলো আফ্রিকান এপিডেমিক ফান্ড, যা ২০২৫ সালে আফ্রিকান ইউনিয়ন দ্বারা চালু করা হয়েছিল। দ্রুত এবং স্থানীয়ভাবে জরুরি স্বাস্থ্য পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এই নতুন তহবিলটিকে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার সাথে পরিচালনা করতে হবে।
রাজনৈতিক স্লোগানের ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান
মহামারীর প্রস্তুতিতে কোনো বিরতি বা ছুটির অবকাশ থাকতে পারে না। আফ্রিকান রাজনৈতিক নেতাদের কেবল নির্বাচনী প্রচারণার স্লোগানের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে, আফ্রিকান ইউনিয়নের মতো আঞ্চলিক সংস্থাগুলোর মাধ্যমে এই প্রতিশ্রুতিগুলোকে দৃঢ় জাতীয় আইন ও নীতিতে রূপান্তর করতে হবে।
পরিশেষে, রিপোর্টটি জোর দিয়ে বলেছে যে, তৃণমূল স্তরে জনসাধারণের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং বিশ্বাস ছাড়া ওপর থেকে চাপানো কোনো পরিকাঠামোই সফল হবে না। মহামারীর বিরুদ্ধে আসল প্রতিরোধ তখনই গড়ে উঠবে, যখন স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে জৈব-নিরাপত্তা হুমকির বিরুদ্ধে প্রতিরক্ষার প্রথম সারিতে রেখে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত ও ক্ষমতায়ন করা হবে।

