ওসলোর মাটিতে ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার আর প্রজ্ঞানন্দের অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন। কার্লসেন ও গুকেশ সহ টানা চারজন বিশ্বমানের দাবাড়ুকে হারিয়ে নরওয়ে দাবা ২০২৬-এর চ্যাম্পিয়ন হলেন প্রজ্ঞানন্দ।
ওসলো — আন্তর্জাতিক দাবার আঙিনায় এক অনন্য ইতিহাস রচনা করলেন ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার রামেশবাবু প্রজ্ঞানন্দ। শেষ রাউন্ডের এক হাই-ভোল্টেজ ম্যাচে জার্মানির ভিনসেন্ট কিমারকে হারিয়ে চেন্নাইয়ের এই ২০ বছর বয়সী বিস্ময় বালক টুর্নামেন্টের ১৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম ভারতীয় চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করলেন।
ওসলোর বুকে এই খেতাব জয়ের মাধ্যমে প্রজ্ঞানন্দ টুর্নামেন্টের শেষ সপ্তাহে এক রোমাঞ্চকর পারফরম্যান্স উপহার দিয়ে ১৮ পয়েন্টের সাথে লিডারবোর্ডের শীর্ষে জায়গা করে নেন। তিনি আমেরিকান গ্র্যান্ডমাস্টার ওয়েস্লি সো-কে মাত্র ১ পয়েন্টের ব্যবধানে পেছনে ফেলে এই মর্যাদাপূর্ণ ট্রফি নিজের নামে করেন।
পয়েন্ট টেবিলের তলানি থেকে টানা ৪ ম্যাচ জয়ের রূপকথা
এই টুর্নামেন্টে প্রজ্ঞানন্দের ট্রফি জয়ের পথটি কোনো রূপকথার চেয়ে কম ছিল না। বছরের অন্যতম কঠিন এবং বিশ্বের সেরা খেলোয়াড়দের নিয়ে আয়োজিত এই এলিট ডাবল রাউন্ড-রবিন টুর্নামেন্টের শুরুটা এই তরুণ ভারতীয়র জন্য মোটেও ভালো হয়নি।
পঞ্চম ও ষষ্ঠ রাউন্ডে পর পর দুটি ক্লাসিক্যাল ম্যাচে হেরে প্রজ্ঞানন্দ পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে চলে গিয়েছিলেন এবং তৎকালীন টুর্নামেন্ট লিডার ওয়েস্লি সো-র থেকে ৫.৫ পয়েন্টের এক বিরাট ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েন।
খিতাবের লড়াইয়ে টিকে থাকার জন্য তখন তাঁর প্রতি ম্যাচে স্পষ্ট জয় ছাড়া কোনো পথ ছিল না। এর পরই প্রজ্ঞানন্দ আন্তর্জাতিক সুপার-টুর্নামেন্টের ইতিহাসে অন্যতম সেরা কামব্যাক উপহার দিয়ে পর পর ৪টি ক্লাসিক্যাল ম্যাচে জয় ছিনিয়ে নেন:
- রাউন্ড ৭: সাবেক ওয়ার্ল্ড ব্লিটজ চ্যাম্পিয়ন আলিরেজা ফিরোউজাকে হারান।
- রাউন্ড ৮: বিশ্বের এক নম্বর খেলোয়াড় ও ঘরের ছেলে ম্যাগনাস কার্লসেনকে পরাস্ত করেন।
- রাউন্ড ৯: আমরাত্ন তথা বর্তমান বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ চ্যালেঞ্জার ডি গুকেশকে হারিয়ে দেন।
- রাউন্ড ১০: শেষ রাউন্ডে সাদা ঘুঁটি নিয়ে খেলে অপরাজিত ভিনসেন্ট কিমারকে মাত করেন।
শেষ রাউন্ডের চূড়ান্ত ফয়সালা
দশম তথা চূড়ান্ত রাউন্ডে নামার আগে প্রজ্ঞানন্দ ওয়েস্লি সো-র থেকে অর্ধেক পয়েন্টে পিছিয়ে ছিলেন, যার অর্থ ম্যাচ ড্র হলে টুর্নামেন্ট জিতে যেতেন আমেরিকান তারকা। কিমারের বিরুদ্ধে সাদা ঘুঁটি নিয়ে শুরু থেকেই প্রজ্ঞানন্দ আক্রমণাত্মক ও জটিল চালের কৌশল বেছে নেন।
ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণকারী মুহূর্তটি আসে ৩০ নম্বর চালে। কিমার তাঁর 30…h5 চালের মাধ্যমে একটি মারাত্মক পজিশনাল ভুল করে বসেন, যা ধরতে বিন্দুমাত্র ভুল করেননি ভারতীয় গ্র্যান্ডমাস্টার। প্রজ্ঞানন্দ নিখুঁত হিসাব কষে 31.Rb8+! Kh7 32.Nef3! চালের মাধ্যমে ম্যাচে এক বড় ও নির্ণায়ক সুবিধা আদায় করে নেন।
খেলা শেষের দিকে তাঁর ঘুঁটির চালগুলি ক্লিনিক্যালি নিখুঁত হলেও, ম্যাচ শেষে প্রজ্ঞানন্দ সাংবাদিকদের কাছে স্বীকার করেন যে প্রবল মানসিক চাপ তৈরি হয়েছিল: “আমি আর কোনো চিন্তাই করতে পারছিলাম না—আমার হাত যেন নিজেই চাল দিচ্ছিল!”
ক্লাসিক্যাল ম্যাচে জিতে প্রজ্ঞানন্দ পূর্ণ ৩ পয়েন্ট নিশ্চিত করার পর, সবার নজর ছিল ওয়েস্লি সো-র ম্যাচের দিকে। আলিরেজা ফিরোউজা ক্লাসিক্যাল ম্যাচে ওয়েস্লি সো-কে ড্র-তে আটকে দেন এবং সো কেবল পরবর্তী আর্মাগেডন টাইব্রেকারটি জিততে সক্ষম হন। এর ফলে ওয়েস্লি সো ১৭ পয়েন্টে থমকে যান এবং এককভাবে চ্যাম্পিয়নশিপ চলে যায় ভারতের ঝুলিতে।
চূড়ান্ত পয়েন্ট তালিকা
| র্যাঙ্ক | খেলোয়াড় | পয়েন্ট | বর্তমান স্থিতি |
| 🥇 ১ | আর প্রজ্ঞানন্দ (ভারত) | ১৮.০ | টুর্নামেন্ট চ্যাম্পিয়ন |
| 🥈 ২ | ওয়েস্লি সো (আমেরিকা) | ১৭.০ | রানার্স-আপ |
| 🥉 ৩ | আলিরেজা ফিরোউজা (ফ্রান্স) | ১৫.৫ | তৃতীয় স্থান |
| ♟️ ৪ | ম্যাগনাস কার্লসেন (নরওয়ে) | – | চতুর্থ স্থান |
এই ঐতিহাসিক জয় প্রজ্ঞানন্দের জন্য এক দুর্দান্ত প্রত্যাবর্তন হিসেবে চিহ্নিত হবে। গত ১০ মাসের এক কঠিন সময়ে তাঁর লাইভ রেটিং ২৭৮০-র কোঠা থেকে নেমে ২৭৩০-এ চলে গিয়েছিল। এই একটি টুর্নামেন্ট থেকেই ১৫.২ রেটিং পয়েন্ট অর্জন করে তিনি আবারও ২৭৫০-এর গণ্ডি পার করেছেন এবং বিশ্ব লাইভ রেটিং তালিকায় ১১ নম্বর স্থানে উঠে এসেছেন।
ওসলোর ভেন্যু থেকে বেরোনোর সময় দাবা ভক্তদের এক বিশাল দল চ্যাম্পিয়ন প্রজ্ঞানন্দকে ঘিরে ধরে উল্লাস প্রকাশ করে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পর হাসিমুখে প্রজ্ঞানন্দ জানান যে তিনি এখনই পরবর্তী বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ ক্যান্ডিডেটস সাইকেল নিয়ে ভাবছেন না: “সম্প্রতি বেশ কিছু জিনিস আমার মনের মতো হচ্ছিল না… এই মুহূর্তে আমি শুধু আমার খেলাটা উপভোগ করতে চাই।”

