গ্লোবাল ওয়েদার ডেস্ক
নিরক্ষীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশে লুকিয়ে থাকা এক বিশাল উষ্ণ জলের স্রোত বা মহাসাগরীয় তাপ (Ocean Heat) বিশ্বজুড়ে আবহাওয়ার এক চরম বিপদ বা “কোড রেড” সংকেত জারি করেছে। আন্তর্জাতিক আবহাওয়া সংস্থাগুলির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শেষের দিকে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী এবং সমস্ত রেকর্ড ভেঙে দেওয়ার মতো ‘সুপার এল নিনো’ (Super El Niño) দ্রুত তার ডানা মেলছে।
বিশ্বের প্রধান আবহাওয়া মডেলগুলির বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ৯৬% সম্ভাবনা রয়েছে যে এই উষ্ণতার চক্রটি ২০২৬-২০২৭ সালের শীতকাল পর্যন্ত স্থায়ী হবে। বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, এবার প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে +3.0o C to +4.0oC পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে। যদি এই পূর্বাভাস সত্যি হয়, তবে এটি ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ এল নিনো বছরগুলির (যেমন ১৯৯৭-১৯৯৮ এবং ২০১৫-২০১৬) ক্ষয়ক্ষতিকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বর্তমান পরিস্থিতি: স্যাটেলাইটের চোখে এখন যা দেখা যাচ্ছে
নাসা (NASA) এবং ইউরোপীয় মহাকাশ সংস্থা (ESA)-র যৌথ স্যাটেলাইট মিশন ‘সেন্টিনেল-৬ মাইকেল ফ্রেইলিচ’ (Sentinel-6 Michael Freilich) বাস্তব সময়ে এই আসন্ন সংকটের স্পষ্ট প্রমাণ ধারণ করেছে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ইঞ্চির ভগ্নাংশ পর্যন্ত নিখুঁতভাবে পরিমাপ করতে সক্ষম এই স্যাটেলাইটটি জানিয়েছে, এই বছরের শুরুতে মাইক্রোনেশিয়ার কাছে প্রশান্ত মহাসাগরে শক্তিশালী পশ্চিমা বাতাসের ঝাপটা দেখা গিয়েছিল। এই বাতাস সমুদ্রের জলস্তরে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করে, যার ফলে জলের নিচে এক বিশাল তরঙ্গমালার সৃষ্টি হয়, যাকে বিজ্ঞানীরা বলেন কেলভিন ওয়েভ (Kelvin Waves)।
যেহেতু জল উত্তপ্ত হলে আয়তনে প্রসারিত হয়, তাই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মেপে বিজ্ঞানীরা জলের নিচের তাপমাত্রা নির্ভুলভাবে নির্ণয় করতে পারেন। স্যাটেলাইট ডেটা দেখাচ্ছে যে, গত মার্চ মাসে তৈরি হওয়া একটি অত্যন্ত শক্তিশালী কেলভিন তরঙ্গ ইতিমধ্যেই পুরো মহাসাগর পাড়ি দিয়েছে। এর ফলে পেরু, ইকুয়েডর এবং কলম্বিয়ার উপকূলবর্তী অঞ্চলে সমুদ্রের জলস্তর দীর্ঘকালীন গড় উচ্চতার চেয়ে ৫.৯ ইঞ্চি (১৫ সেন্টিমিটার)-রও বেশি উপরে উঠে গেছে—যা প্রমাণ করে যে সমুদ্রের তলদেশ থেকে এক বিশাল তাপের মহাসমুদ্র উপরে চলে এসেছে।
এটি কীভাবে কাজ করে: সুপার এল নিনোর ইঞ্জিন
একটি সাধারণ এল নিনো এবং এই ‘সুপার’ এল নিনোর কাজের প্রক্রিয়াটি নিচে সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হলো:
- স্বাভাবিক অবস্থা: সাধারণ সময়ে, নিরক্ষরেখা বরাবর পূর্ব থেকে পশ্চিমে শক্তিশালী বাণিজ্য বায়ু (Trade Winds) প্রবাহিত হয়। এই বাতাস প্রশান্ত মহাসাগরের উপরিভাগের গরম জলকে ইন্দোনেশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার দিকে ঠেলে নিয়ে যায়। এর ফলে দক্ষিণ আমেরিকার (যেমন পেরু) উপকূলে সমুদ্রের গভীর থেকে ঠান্ডা ও পুষ্টিকর জল উপরে উঠে আসে।
- এল নিনোর পরিবর্তন: কোনো এক অজানা কারণে যখন এই বাণিজ্য বায়ু দুর্বল হয়ে পড়ে বা উল্টো দিকে (পশ্চিম থেকে পূর্বে) বইতে শুরু করে, তখন পশ্চিমাংশের সেই গরম জলের বিশাল ভাণ্ডার আর বাধা ধরে রাখতে পারে না। তা কেলভিন তরঙ্গের আকারে তীব্র গতিতে দক্ষিণ আমেরিকার দিকে ধেয়ে আসে।
- ‘সুপার’ এল নিনোর কারণ: ২০২৬ সালের এই ঘটনাটি আরও বেশি বিপজ্জনক, কারণ গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে পৃথিবীর বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরগুলির তাপমাত্রা ইতিমধ্যেই ইতিহাসের সর্বোচ্চ স্তরে রয়েছে। এই অবস্থায় কেলভিন তরঙ্গ যখন দক্ষিণ আমেরিকার ঠান্ডা জলের প্রবাহকে সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়, তখন পৃথিবীর সামগ্রিক ‘জেট স্ট্রিম’ (বায়ুপ্রবাহের চক্র) ভেঙে পড়ে, যা সাধারণ এল নিনোকে ‘সুপার এল নিনো’-তে রূপান্তর করে।
বৈশ্বিক প্রভাব: পৃথিবীর ওপর এর কী প্রভাব পড়বে?
যেহেতু এল নিনো সাধারণত নভেম্বর থেকে জানুয়ারির মধ্যে তার সর্বোচ্চ তীব্রতায় পৌঁছায়, তাই আগামী মাসগুলিতে বিশ্ব বাণিজ্য, কৃষি এবং মানুষের জনজীবনে এর মারাত্মক প্রভাব দেখা যাবে:
| অঞ্চল / ক্ষেত্র | ২০২৬ সালের এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব |
| বৈশ্বিক তাপমাত্রা | সমুদ্রের এই অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ার ফলে ২০২৬ এবং ২০২৭ সাল পৃথিবীর ইতিহাসের উষ্ণতম বছর হতে পারে। |
| ভারত ও দক্ষিণ এশিয়া | এর প্রভাবে ভারতে মৌসুমি বায়ু বা বর্ষা অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়তে পারে, যার ফলে খরা, তীব্র দাবদাহ এবং কৃষিক্ষেত্রে বিপর্যয় নেমে আসবে। |
| আমেরিকা মহাদেশ | পেরু এবং ইকুয়েডরে রেকর্ড ভাঙা বন্যা ও ভূমিধস হবে, অন্যদিকে ক্যালিফোর্নিয়াতে শীতকালে অতিভারী বৃষ্টিপাত দেখা দেবে। |
| অস্ট্রেলিয়া ও আফ্রিকা | এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাত প্রায় বন্ধ হয়ে তীব্র খরা দেখা দেবে এবং বনাঞ্চলে ভয়াবহ দাবানল (Wildfires) সৃষ্টি হবে। |
| সামুদ্রিক অর্থনীতি | সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে কোরাল রিফ বা প্রবাল প্রাচীর ধ্বংস হয়ে যাবে এবং দক্ষিণ আমেরিকা উপকূলে মাছের আকাল দেখা দেওয়ায় মৎস্য শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে। |
নাসার বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিটি এল নিনোর চরিত্র আলাদা হলেও, তা পৃথিবীর কোনো অংশে চরম খরা এবং কোনো অংশে বিধ্বংসী বন্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশের সরকারকে এখন থেকেই এই স্যাটেলাইট সতর্কবার্তা মেনে বিপর্যয় মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

