মহাশক্তিশালী ‘কোয়ান্টাম-অন-চিপ’-এর পথে মানবজাতি
তথ্যপ্রযুক্তি এবং পদার্থবিজ্ঞানের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে বিজ্ঞানীরা হিরের খাঁচায় কৃত্রিম উপায়ে নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎ পরিবাহী পথ বা ‘ট্যূনেবল সুপারকন্ডাক্টিং রিজিয়ন’ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন। এই অভাবনীয় আবিষ্কারের ফলে আগামী দিনে একটি ক্ষুদ্র চিপের মধ্যেই সম্পূর্ণ কোয়ান্টাম কম্পিউটার বা “কোয়ান্টাম-অন-চিপ” (Quantum-on-chip) তৈরি করা সম্ভব হবে, যা বর্তমান বিশ্বের সুপার কম্পিউটারগুলির চেয়ে কোটি গুণ দ্রুত কাজ করতে পারবে।
হিরের ভেতরের কার্বন পরমাণুর বিন্যাস অত্যন্ত নিখুঁত হওয়ায় কোয়ান্টাম ডেটা ধরে রাখার জন্য একে শ্রেষ্ঠ উপাদান ধরা হয়। কিন্তু এতদিন হিরের চিপের সাথে কোয়ান্টাম সার্কিট জুড়তে গেলে বিভিন্ন ধাতুর সূক্ষ্ম তার ব্যবহার করতে হতো, যা প্রচণ্ড ঠাণ্ডায় সংকুচিত হয়ে নষ্ট হয়ে যেত। নতুন এই প্রযুক্তিতে কোনো বাইরের ধাতুর সংযোগ ছাড়াই সরাসরি হিরের ভেতর বিদ্যুৎ প্রবাহের রাস্তা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।
বোরন ডোপিং: হিরেকে সুপারকন্ডাক্টরে রূপান্তর
সাধারণ অবস্থায় হিরে হলো একটি পরম বিদ্যুৎ অপরিবাহী (Insulator) পদার্থ, অর্থাৎ এর মধ্য দিয়ে কারেন্ট যাতায়াত করতে পারে না। এই অসাধ্য সাধন করতে গবেষকরা হিরের কার্বন ল্যাটিসের মধ্যে কৃত্রিম উপায়ে বোরন (Boron) পরমাণু প্রবেশ করিয়েছেন, যাকে ন্যানো-প্রযুক্তির ভাষায় ‘ডোপিং’ বলা হয়।
কার্বনের তুলনায় বোরন পরমাণুতে একটি ইলেকট্রন কম থাকায় এটি হিরের ভেতরের গঠনে ফাঁকা স্থান বা ‘হোল’ (Hole)-এর সৃষ্টি করে। যখন এই বিশেষ হিরেকে পরম শূন্য তাপমাত্রার কাছাকাছি ঠাণ্ডা করা হয়, তখন এই হোলগুলি কোনো রকম প্রতিরোধ বা তাপ তৈরি ছাড়াই বিদ্যুৎ শক্তিকে অনায়াসে যাতায়াত করতে সাহায্য করে—যাকে বিজ্ঞানের ভাষায় ‘সুপারকন্ডাক্টিভিটি’ বলে।
এই আবিষ্কারের আসল ম্যাজিক হলো এর ট্যূনেবিলিটি বা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা: বিজ্ঞানীরা বাইরে থেকে হালকা ভোল্টেজ প্রয়োগ করে হিরের ভেতরের এই সুপারকন্ডাক্টিং পাওয়ারকে যখন খুশি বাড়াতে, কমাতে বা সম্পূর্ণ বন্ধ করতে পারেন। এর ফলে চিপের ভেতরে থাকা কোয়ান্টাম বিট বা ‘কুবিট’ (Qubits) গুলিকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ডেটা রুট করা অনেক সহজ হবে।
কেন এই আবিষ্কার প্রযুক্তি দুনিয়াকে বদলে দেবে?
বর্তমানের কোয়ান্টাম কম্পিউটারগুলি আকারে বিশাল হয় কারণ তাদের মেমোরি ও প্রসেসর আলাদা আলাদা ধাতু দিয়ে তৈরি করতে হয়। কিন্তু এই নতুন আবিষ্কারের ফলে এবার হিরের একটি মাত্র একক টুকরোর (Monolithic Sheet) ভেতরেই প্রসেসর এবং মেমোরি ব্যাংক দুটোই একসাথে খোদাই করা যাবে। এর ফলে চিপের স্থায়িত্ব হাজার গুণ বেড়ে যাবে, ডেটা লিক হওয়ার ঝুঁকি বা ‘ডিকোহেরেন্স’ কমবে এবং বিশাল কুলিং সিস্টেমের আকারও অনেক ছোট হয়ে আসবে। আগামী দিনে ওষুধ আবিষ্কার, জটিল কোড ক্র্যাকিং এবং মহাকাশ গবেষণার জন্য এই হিরের তৈরি চিপই হবে আসল চালিকাশক্তি।

