বিদ্যুৎ ক্ষেত্রের পরিকাঠামো পর্যালোচনা
রাজ্যের বিদ্যুৎ পরিকাঠামোর ক্ষেত্রে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল ত্রিপুরা ইলেক্ট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশন (TERC)। ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের জন্য নতুন বিদ্যুৎ শুল্ক বা ট্যারিফ অর্ডার আনুষ্ঠানিকভাবে জারি করেছে কমিশন। ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন লিমিটেড (TSECL)-এর দেওয়া ‘মাল্টি-ইয়ার ট্যারিফ’ (MYT) আবেদনের ওপর ভিত্তি করে, দীর্ঘ গণশুনানি ও উপদেষ্টা কমিটির পর্যালোচনার পর এই সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়েছে।
যেহেতু TSECL বিদ্যুৎ উৎপাদন (Generation), পরিবহন (Transmission) এবং বণ্টন (Distribution)—তিনটি ক্ষেত্রেই একচেটিয়া কাজ করে, তাই কমিশন তাদের প্রতিটি বিভাগের আয়-ব্যয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ অডিট করেছে। চূড়ান্ত আদেশে একদিকে বিদ্যুৎ নিগমের আর্থিক স্থায়িত্ব এবং অন্যদিকে সাধারণ গ্রাহকদের সামর্থ্য—উভয় দিকের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা হয়েছে, যাতে গ্রাহকদের ওপর হঠাৎ কোনো বড় আর্থিক ধাক্কা না আসে।
আর্থিক হিসাব: বিগত ঘাটতি ও পর্যায়ক্রমিক আদায়
এই প্রক্রিয়ার একটি অন্যতম প্রধান অংশ ছিল ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের ‘ট্রুয়িং আপ’ (Truing Up) বা প্রকৃত হিসাবের মূল্যায়ন। এর মাধ্যমে বিদ্যুৎ নিগমের পূর্ববর্তী অনুমিত খরচের সাথে বাস্তব খরচের মিল খতিয়ে দেখা হয়।
- বিপুল ঘাটতি: প্রাকৃতিক গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং বিদ্যুৎ ক্রয়ের খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণে TSECL মোট ১৭.০৯ বিলিয়ন টাকার পুঞ্জীভূত রাজস্ব ঘাটতি দেখিয়েছিল।
- ৪৩% বৃদ্ধির আবেদন খারিজ: এই ঘাটতি একবারে মেটাতে নিগম মোট ২১.৬৪ বিলিয়ন টাকার রাজস্ব আদায়ের দাবি জানায়, যা কার্যকর হলে বিদ্যুৎ বিল এক ধাক্কায় ৪৩% বৃদ্ধি পেত এবং সাথে একটি অতিরিক্ত ‘রেগুলেটরি সারচার্জ’ যুক্ত হতো।
- গ্রাহকদের স্বস্তি: সুপ্রিম কোর্ট এবং অ্যাপেল ট্রাইব্যুনালের (APTEL) নির্দেশিকা মেনে TERC এই অতিরিক্ত সারচার্জের দাবি সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের ঘাটতির সম্পূর্ণ বোঝা এই এক বছরেই গ্রাহকদের ওপর না চাপিয়ে তা আগামী কয়েক বছরে ধাপে ধাপে আদায়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। কমিশন চূড়ান্ত শুল্ক আদায়ের পরিমাণ ১২.৭৫ বিলিয়ন টাকায় সীমাবদ্ধ করেছে এবং এর সাথে ৭৭০ মিলিয়ন টাকার সরকারি ভর্তুকি যুক্ত করেছে।
গ্রাহকদের বিদ্যুৎ বিলে প্রভাব
নতুন সংশোধিত ট্যারিফ কাঠামোয় ব্যবহারের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে সামান্য বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে:
- গার্হস্থ্য বা গৃহস্থালি গ্রাহক (১৫০ ইউনিট পর্যন্ত): প্রতি ইউনিটে মাত্র ১৫ পয়সা বৃদ্ধি।
- গার্হস্থ্য (১৫০ ইউনিটের বেশি), সেচ এবং রাস্তার আলো: প্রতি ইউনিটে ২০ পয়সা বৃদ্ধি।
- অন্যান্য সমস্ত বিভাগ (commercial & industrial): প্রতি ইউনিটে ৩৫ পয়সা বৃদ্ধি।ফিক্সড চার্জ বা স্থায়ী শুল্ক আগের মতোই কানেক্টেড লোড প্রতি কিলোওয়াট ($kW$) হিসেবেই ধার্য করা হবে।
‘টাইম-অফ-ডে’ (ToD) বিলিং ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক
২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের আদেশের সবচেয়ে বড় সংস্কার হলো—ছোট গৃহস্থালি ও কৃষিকাজ বাদে বাকি সমস্ত বড় গ্রাহকদের জন্য ‘টাইম-অফ-ডে’ (ToD) ট্যারিফ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা।
- সৌর ঘণ্টার ছাড় (সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা): দিনের বেলা যখন গ্রিডে সৌর বিদ্যুতের উৎপাদন সর্বোচ্চ থাকে, সেই সময়ে বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে সাধারণ হারের চেয়ে ২০% ছাড় দেওয়া হবে (অর্থাৎ মূল বিলের ৮০ শতাংশ নেওয়া হবে)।
- সন্ধ্যার পিক আওয়ার চার্জ (বিকেল ৫টা থেকে রাত ১০টা): উল্টোদিকে, সন্ধ্যার সময়ে যখন গ্রিডের ওপর চাপ সবচেয়ে বেশি থাকে, তখন বিদ্যুৎ ব্যবহারের জন্য বেশি হারে বিল দিতে হবে। এই ব্যবস্থা সঠিকভাবে পরিচালনার জন্য রাজ্যে দ্রুত স্মার্ট মিটার বসানোর কাজ তরান্বিত করা হচ্ছে।

