নয়াদিল্লি — ভারতের কৃষি লজিস্টিকস পরিকাঠামো ক্ষেত্রে এক বিশাল কর্পোরেট কেন্দ্রীকরণ বা ধ্রুবীকরণ সামনে এসেছে। সরকারি নীতিতে কাঠামোগত পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক সুরক্ষাকবচ ধারাটি বাতিল করার পর, দুটি বেসরকারি সংস্থা—আদানি এগ্রি লজিস্টিকস লিমিটেড (Adani Agri Logistics Ltd) এবং লিপ ইন্ডিয়া ফুড অ্যান্ড লজিস্টিকস (Leap India Food & Logistics)—যৌথভাবে ফুড কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়ার (FCI) মেগা আধুনিক শস্যভাণ্ডার কর্মসূচির ৮০ শতাংশেরও বেশি চুক্তি নিজেদের দখলে নিয়েছে।
রেশন ব্যবস্থার (PDS) খাদ্যশস্য মজুত প্রক্রিয়াকে আধুনিক ও নিরাপদ করতে ২০,০০০ কোটি টাকার “হাব অ্যান্ড স্পোক” স্টিল সাইলো প্রকল্প চালু করা হয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক দরপত্রের ফলাফল বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, প্রথম দুটি ধাপে বরাদ্দ করা মোট ১৩৪টি সাইলো চুক্তির মধ্যে আদানি-লিপ ইন্ডিয়া জোট একচ্ছত্রভাবে ১৬,৫০০ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের ১১০টি চুক্তি হাতিয়ে নিয়েছে।
নীতিগত পরিবর্তন: একাধিপত্য-বিরোধী ধারা বাতিল
বাজারের এই চরম মেরুকরণের মূল সূত্রপাত ঘটেছিল ২০২২ সালের একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে। কোনো একক বেসরকারি শিল্প গোষ্ঠী যাতে দেশের সংবেদনশীল খাদ্য পরিকাঠামোর ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে না পারে, সেজন্য এফসিআই প্রাথমিকভাবে টেন্ডারের নীতিমালায় একটি কঠোর “অ্যান্টি-মনোপলি” (একাধিপত্য-বিরোধী) ধারা অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর উদ্দেশ্য ছিল নির্দিষ্ট কোনো জোনে বা রাজ্যে একটি মাত্র সংস্থাকে সব প্রকল্প দেওয়া থেকে বিরত রাখা।
কিন্তু ২০২২ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি নির্ধারণী বৈঠকে সরকারের শীর্ষ উপদেষ্টা সংস্থা নীতি আয়োগ (NITI Aayog) এবং অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক বিষয়ক বিভাগ (DEA) এই বিধিনিষেধের তীব্র বিরোধিতা করে।
সরকারি সংস্থাগুলোর যুক্তি: কেন্দ্রীয় পরিকল্পনাকারীদের দাবি ছিল, বিডিং ক্ষমতার ওপর সর্বোচ্চ সীমা আরোপ করলে তা উন্মুক্ত বাজারের স্বাভাবিক প্রতিযোগিতা ও শক্তিকে বাধাগ্রস্ত করে। বিপুল পরিমাণ বেসরকারি পুঁজি দ্রুত আকর্ষণ করা এবং উচ্চ প্রযুক্তিসম্পন্ন পরিকাঠামো নির্মাণে গতি আনার স্বার্থে তারা মুক্ত বাজার নীতি বজায় রাখার পরামর্শ দেন।
এই চাপের মুখে নতি স্বীকার করে এফসিআই সুরক্ষাকবচ ধারাটি পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নেয়। এর পরপরই, আদানি এগ্রি লজিস্টিকস প্রথম ফেজের পরবর্তী রাউন্ডের প্রতিটি চুক্তি জিতে নেয়। আর দ্বিতীয় ফেজ শেষ হতে হতে পুরো প্রকল্পটি একটি স্পষ্ট দ্বিপাক্ষিক একাধিপত্যে (Duopoly) রূপ নেয়।
বরাদ্দ ও সংরক্ষণ ক্ষমতার খতিয়ান
আঞ্চলিক স্তরে ক্ষুদ্র পুঁজিপতিদের সুযোগ না দিয়ে বৃহৎ পুঁজির সংস্থাকে ছাড় দেওয়ার ফলে দেশের ভবিষ্যৎ খাদ্য নিরাপত্তার নিয়ন্ত্রণ কীভাবে কেন্দ্রীভূত হয়েছে, তা নিচের পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট:
- মোট বরাদ্দকৃত চুক্তি: মোট ১৩৪টি চুক্তির মধ্যে ১১০টি চুক্তিই আদানি ও লিপ ইন্ডিয়ার দখলে।
- আর্থিক মূল্যের বণ্টন: ২০,০০০ কোটি টাকার মোট বাজেটের মধ্যে প্রায় ১৬,৫০০ কোটি টাকা এই দুই সংস্থার ঝুলিতে গেছে (যার মধ্যে সাম্প্রতিকতম রাউন্ডে আদানি গ্রুপ একাই ৯,৭০০ কোটি টাকার চুক্তি জিতেছে)।
- সংরক্ষণ ক্ষমতা বণ্টন: দেশের মোট ৬০ লক্ষ মেট্রিক টন (LMT) লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে ৪৬.৫ লক্ষ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য জমা থাকবে এই দুটি কোম্পানির নিজস্ব সাইলোতে। বাকি সমস্ত প্রতিযোগীদের জন্য পড়ে রয়েছে মাত্র ১৩.৫ LMT ক্ষমতা।
আধুনিকীকরণ বনাম বাজারের প্রতিযোগিতার সংকট
কার্যকারিতার দিক থেকে, এই স্বয়ংক্রিয় স্টিল সাইলো নির্মাণ দেশের পুরোনো খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থার ভোলবদল করার জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল। তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার কারণে এই সাইলোতে খোলা আকাশের নিচে রাখা সনাতনী ব্যবস্থার মতো শস্য পচে যাওয়া বা পোকা-মাকড়ের উপদ্রবের ভয় থাকে না। এছাড়া নিজস্ব রেললাইনের সুবিধা থাকায় মাঠ থেকে সরাসরি ট্রেনের ওয়াগনে শস্য লোড করা যায়, যা পরিবহনের সময় বাঁচায়।
তবে বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন যে, ভারতের নিজস্ব বাজার প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রক সংস্থা, কম্পিটিশন কমিশন অফ ইন্ডিয়া (CCI), সবসময়ই যেকোনো ক্ষেত্রে অতিরিক্ত বাজার কেন্দ্রীকরণ এবং একচেটিয়া আচরণকে জনস্বার্থের পরিপন্থী হিসেবে চিহ্নিত করে। এই ক্ষেত্রে, স্বয়ং সরকারি দপ্তরগুলো সুরক্ষাকবচ তুলে নেওয়ায় ছোট এবং আঞ্চলিক স্তরের ঠিকাদারেরা প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে গেছেন, যার ফলে দেশের খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খলের মূল চাবিকাঠি এখন মাত্র দুটি বেসরকারি কর্পোরেট জায়ান্টের হাতে বন্দি।

