প্রাচীন সভ্যতার এক আধুনিক শিক্ষা
নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক বিকাশ সংক্রান্ত আধুনিক ধারণাকে সম্পূর্ণ বদলে দিয়ে এক নতুন গবেষণায় জানা গেছে যে, সিন্ধু সভ্যতার বৃহত্তম শহর মহেঞ্জোদারো যত উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়েছিল, সেখানে ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান ততটাই কমে এসেছিল।
মিশর বা গ্রিসের মতো সমসাময়িক সভ্যতাগুলি যখন তাদের রাজা কিংবা ঈশ্বর-রাজাদের জন্য বিশাল পিরামিড বা রাজপ্রাসাদ নির্মাণে ব্যস্ত ছিল, তখন মহেঞ্জোদারো হেঁটেছিল সম্পূর্ণ বিপরীত এক প্রগতিশীল পথে। ঐতিহ্যবাহী অ্যান্টিকুইটি (Antiquity) জার্নালে প্রকাশিত ইউনিভার্সিটি অফ ইয়র্ক-এর গবেষকদের এই নতুন গবেষণাটি দেখিয়েছে যে, একটি সমাজ বিশাল আকারে উৎপাদনশীল হয়েও কীভাবে ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণ ও সম্পদের সুষম বণ্টন নিশ্চিত করতে পারে।
সময়ের সাথে সাথে কমেছিল বাসস্থানের ভেদাভেদ
ইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্ব বিভাগের গবেষকরা এই প্রাচীন শহরের আবাসন ও স্থাপত্য সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন। গবেষণার প্রধান দিকগুলি ছিল:
- ছোট ও বড় বাড়ির ব্যবধান হ্রাস: মহেঞ্জোদারো যখন একটি পরিপক্ক এবং বিশাল অর্থনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হচ্ছিল, তখন শহরের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ছোট বাড়িগুলির মধ্যকার আয়তনের পার্থক্য ক্রমশ কমে আসছিল।
- গ্রামীণ সাম্যের প্রতিফলন: শহরটির শেষ পর্যায়ে এসে ভেদাভেদের এই গ্রাফটি এতটাই নেমে গিয়েছিল, যা সাধারণত প্রাচীনকালের সাধারণ কৃষিজীবী গ্রামগুলিতে দেখা যেত।
গবেষণার প্রধান লেখক অ্যাডাম গ্রিন বলেন, “মিশরীয়রা যখন দেবতাদের জন্য পিরামিড বানাচ্ছিল, সিন্ধু উপত্যকার মানুষ তখন সম্পূর্ণ অন্য কিছু তৈরি করছিল। সোনার সমাধি বা বিশাল মন্দিরের বদলে মহেঞ্জোদারো জোর দিয়েছিল উন্নত ইটের নর্দমা এবং সুপরিকল্পিত রাস্তার ওপর।”
গণতান্ত্রিক শাসন ও ন্যায্য বাণিজ্যের পরিকাঠামো
মহেঞ্জোদারোর খননকার্যে কোনো রাজপ্রাসাদ, শাসকের মূর্তি বা সোনা-দানা ভর্তি অভিজাত সমাধি পাওয়া যায়নি। এর পরিবর্তে যা পাওয়া গেছে, তা নাগরিক সাম্যের এক অভূতপূর্ব দলিল:
- সাধারণ ঘরে সিন্ধু সিলমোহর: ব্যবসা ও প্রশাসনের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার বা প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত বিখ্যাত ‘সিন্ধু সিলমোহর’ (Indus Seals) কোনো কেন্দ্রীয় রাজকোষ বা প্রাসাদে কুক্ষিগত ছিল না। এগুলি সাধারণ মানুষের ঘর থেকেই বেশি উদ্ধার হয়েছে।
- একক ওজন ও পরিমাপ পদ্ধতি: সমগ্র অঞ্চল জুড়ে বাটখারা এবং পরিমাপের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও মানদণ্ড অনুযায়ী (Standardized) ব্যবস্থা চালু ছিল, যা প্রতিটি নাগরিকের জন্য ন্যায্য বাণিজ্য সুনিশ্চিত করত।
- জনকল্যাণমূলক পরিকাঠামো: উন্নত জল নিষ্কাশন ব্যবস্থা, নর্দমা ও রাস্তাঘাটের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের পেছনেই সমাজ তার মূল পুঁজি বিনিয়োগ করত, যাতে প্রতিটি নাগরিক সমান নাগরিক সুবিধা ভোগ করতে পারেন।
আধুনিক অর্থনীতির ধারণাকে চ্যালেঞ্জ
বর্তমান যুগের অর্থনীতিবিদ ও সমাজবিজ্ঞানীদের জন্য মহেঞ্জোদারো এক বিরাট শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। আধুনিক পুঁজিবাদের ধারণা বলে যে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলে সমাজে কিছুটা বৈষম্য বৃদ্ধি পাওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মহেঞ্জোদারো প্রমাণ করেছে যে, সম্পদ ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা মুষ্টিমেয় কিছু মানুষের হাতে কেন্দ্রীভূত না করেও একটি সমাজ অত্যন্ত উৎপাদনশীল এবং শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে টেকসই হতে পারে। সম্পদের এই সুষম বণ্টনই হয়তো তাদের দীর্ঘস্থায়ী সমৃদ্ধির মূল চাবিকাঠি ছিল।

