পাকিস্তান-আফগানিস্তান যুদ্ধ তুঙ্গে: কেন আফগানিস্তানে বিমান হামলা চালাল পাকিস্তান, যার শিকার হলো ১১টি শিশু

The Airstrikes Came A Day After Suspected Pakistani Taliban Militants Attacked A Security Post In The Hasan Khel Area Of Khyber Pakhtunkhwa Province, Bordering Afghanistan
The Airstrikes Came A Day After Suspected Pakistani Taliban Militants Attacked A Security Post In The Hasan Khel Area Of Khyber Pakhtunkhwa Province, Bordering Afghanistan (PC: Social Media Sites)

কাবুল/ইসলামাবাদ — পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে চলমান ২০২৬ সালের সীমান্ত যুদ্ধ বুধবার এক মারাত্মক ও নজিরবিহীন রূপ নিয়েছে। আফগানিস্তানের পূর্ব সীমান্ত প্রদেশে পাকিস্তানি বিমানবাহিনীর এক ভয়াবহ নৈশকালীন বোমাবর্ষণে ১১টি শিশুসহ অন্তত ১৩ জন বেসামরিক নাগরিক নিহত হয়েছেন। এই হামলার ফলে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতায় হওয়া সাম্প্রতিক ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি (Ceasefire) সম্পূর্ণরূপে ভেস্তে গেল।

তালেবান সরকারের প্রধান মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ জানিয়েছেন, পাকিস্তানি যুদ্ধবিমান আফগান আকাশসীমা লঙ্ঘন করে খোস্ত, কুনার এবং পাক্তিকা প্রদেশের আবাসিক এলাকা লক্ষ্য করে মধ্যরাতে এই হামলা চালায়। এতে ১১টি শিশু, একজন নারী এবং একজন বয়স্ক পুরুষ নিহত হয়েছেন এবং আরও ১৪ জন বেসামরিক নাগরিক গুরুতর আহত হয়েছেন।

কেন এই প্রতিশোধমূলক বিমান হামলা চালানো হলো?

পাকিস্তানের এই আকস্মিক ও তীব্র সামরিক অভিযানের পেছনে রয়েছে ঘটনার ঠিক ২৪ ঘণ্টা আগে তাদের নিজস্ব নিরাপত্তা বাহিনীর ওপর হওয়া একটি রক্তক্ষয়ী সন্ত্রাসী হামলা।

গত মঙ্গলবার, আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী উত্তর-পশ্চিম খাইবার পাখতুনখোয়ার হাসান খেল এলাকায় একটি আধাসামরিক নিরাপত্তা চৌকিতে অতর্কিত হামলা চালায় উগ্রবাদীরা। দু’পক্ষের মধ্যে চলা তীব্র বন্দুকযুদ্ধে পাকিস্তানের ফেডারেল কনস্টেবুলারির ছয়জন সদস্য নিহত হন

এর জবাবে পাকিস্তানের তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার নিশ্চিত করেছেন যে, পাকিস্তান বিমানবাহিনী সীমান্ত এলাকায় “সুনির্দিষ্ট ও পরিমাপিত” (Precise and Calibrated) হামলা চালিয়েছে। পাকিস্তানের দাবি, এই অভিযানে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP)-এর ২৬ জন সন্ত্রাসী নিহত হয়েছে এবং তাদের চারটি বড় ঘাঁটি ধ্বংস করা হয়েছে:

  • একটি জঙ্গি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র
  • সন্ত্রাসীদের গোপন আস্তানা
  • বিপুল পরিমাণ গোলাবারুদের মজুত
  • শীর্ষ টিটিপি কমান্ডারদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল

পাকিস্তান ও আফগানিস্তান কেন নিজেদের মধ্যে লড়ছে?

এই দীর্ঘমেয়াদী সংঘাতের মূল কারণ হলো সীমান্ত পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসবাদ। ২০২১ সালে কাবুলে আফগান তালেবান ক্ষমতা দখলের পর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক চরম শত্রুতায় রূপ নিয়েছে।

১. টিটিপি (TTP) আস্তানা নিয়ে বিরোধ

ইসলামাবাদ সরাসরি অভিযোগ করে আসছে যে, আফগানিস্তানের তালেবান সরকার তাদের মাটিতে তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (TTP) বা ‘পাকিস্তানি তালেবান’-কে নিরাপদ আশ্রয় দিচ্ছে। পাকিস্তানের দাবি, টিটিপি আফগান মাটিকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পাকিস্তানের বেসামরিক নাগরিক ও সেনা চৌকিতে আত্মঘাতী হামলা চালাচ্ছে। আফগান তালেবান আদর্শগতভাবে টিটিপির সহযোগী হলেও, কাবুল বরাবরই দাবি করে আসছে যে তারা তাদের মাটি অন্য কোনো দেশের বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে দিচ্ছে না।

২. “উন্মুক্ত যুদ্ধ” বা ওপেন ওয়ারের সূচনা

২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের শেষের দিকে দুই দেশের সম্পর্ক পুরোপুরি ভেঙে পড়ে, যখন পাকিস্তান তাদের দেশের অভ্যন্তরে ক্রমাগত সন্ত্রাসী হামলার পর আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে “উন্মুক্ত যুদ্ধ” (Open War) ঘোষণা করে। এরপর থেকে এই লড়াইয়ে শত শত মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, ডুরান্ড লাইনের (Durand Line) দুই পাশে প্রায় ১,১৫,০০০-এর বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। চীনের বেইজিংয়ে দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনা হওয়া সত্ত্বেও এই রক্তক্ষয়ী সংঘাত থামানো সম্ভব হয়নি।

পাকিস্তান সরকার বেসামরিক নাগরিকদের মৃত্যুর খবরকে “মিথ্যা প্রোপাগান্ডা” বলে উড়িয়ে দিলেও, জাতিসংঘ (UN) এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলি এই সীমান্ত যুদ্ধে বারবার নিরীহ শিশু ও নারীদের মৃত্যুর ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।

Share This Article
Exit mobile version