৪ বছর পর ভারত-ইন্দোনেশিয়া যৌথ কমিশনের বৈঠক; দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে ‘নতুন গতি’ দেখছেন জয়শঙ্কর

8th India Indonesia Joint Commission Meeting (jcm), Which Is Being Held After A Gap Of Four Years At New Delhi
8th India Indonesia Joint Commission Meeting (jcm), Which Is Being Held After A Gap Of Four Years At New Delhi (PC: Social Media Sites)

নয়াদিল্লি | ৭ জুন, ২০২৬

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দুই বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশের মধ্যে গভীর ঐতিহাসিক ও কৌশলগত সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়ে, রবিবার নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত হল অষ্টম ভারত-ইন্দোনেশিয়া যৌথ কমিশনের বৈঠক (JCM)। ভারতের বিদেশমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর এবং ইন্দোনেশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সুগিয়োনো যৌথভাবে এই উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন। দীর্ঘ চার বছরের ব্যবধান কাটিয়ে আয়োজিত এই বৈঠকটি দুই দেশের বহুমুখী অংশীদারিত্বকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক।

প্রজাতন্ত্র দিবসের সফরের ঐতিহাসিক প্রভাব

আলোচনার শুরুতে বিদেশমন্ত্রী জয়শঙ্কর উল্লেখ করেন যে, ২০২৫ সালে ভারতের ৭৬তম गणतंत्र দিবসে প্রধান অতিথি হিসেবে ইন্দোনেশিয়ার নবনির্বাচিত রাষ্ট্রপতি প্রবোও সুবিয়ান্তোর ঐতিহাসিক রাষ্ট্রীয় সফর দুই দেশের ‘ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব’ (Comprehensive Strategic Partnership)-এ এক অভূতপূর্ব জোয়ার এনেছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালেই দুই দেশ তাদের দ্বিপাক্ষিক কূটনৈতিক সম্পর্কের ৭৫তম বার্ষিকী উদযাপন করেছে।

বিদেশমন্ত্রী তাঁর স্বাগত ভাষণে বলেন:

“রাষ্ট্রপতি প্রবোও সুবিয়ান্তোর সেই সফরের সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে তাঁর অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল। সেই আলোচনা ও সমঝোতাগুলি নিশ্চিতভাবেই আমাদের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্বকে এক নতুন গতি ও দিশা প্রদান করেছে।”

সহযোগিতার ক্ষেত্রসমূহের বিস্তারিত পর্যালোচনা

এই যৌথ কমিশনের বৈঠকটিকে (JCM) দুই দেশের শীর্ষ নেতৃত্বের নেওয়া বড় সিদ্ধান্ত ও প্রতিশ্রুতিগুলির অগ্রগতি পর্যালোচনার অন্যতম প্রধান প্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। বৈঠকে মূলত যে সমস্ত গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সেগুলি হলো:

  • প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা: ২০০৪ সালে স্বাক্ষরিত সন্ত্রাসবাদ বিরোধী সমঝোতা স্মারকের (MoU) ওপর ভিত্তি করে দুই দেশ তাদের নিরাপত্তা সংলাপ আরও জোরদার করার অঙ্গীকার করেছে। ২০২৪ সালের ২৩ আগস্ট জাকার্তায় অনুষ্ঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের ষষ্ঠ বৈঠকের পর থেকে এই নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও নিবিড় হয়েছে।
  • সামুদ্রিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগ: ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সামুদ্রিক নিরাপত্তা বজায় রাখার পাশাপাশি দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে নতুন নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে।
  • স্বাস্থ্য, ওষুধ শিল্প এবং খাদ্য নিরাপত্তা: চিকিৎসাক্ষেত্রে গবেষণা, উন্নতমানের ওষুধের সরবরাহ ব্যবস্থা সহজ করা এবং দুই দেশের মানুষের পুষ্টি ও খাদ্য নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে যৌথভাবে কাজ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
  • শিক্ষা, পর্যটন ও সংস্কৃতি: দুই দেশের শতাব্দী প্রাচীন সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনকে আরও আধুনিক রূপ দিতে পর্যটন শিল্পের বিকাশ এবং শিক্ষা ক্ষেত্রে ছাত্রছাত্রীদের আদান-প্রদান আরও বাড়ানোর বিষয়ে সহমত পোষণ করেছেন দুই দেশের বিদেশমন্ত্রী।

আসিয়ান (ASEAN)-এর সঙ্গে আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য

বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বৈঠকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে, যখন ভারত ও ইন্দোনেশিয়া উভয় দেশই আসিয়ান-নেতৃত্বাধীন বিভিন্ন আঞ্চলিক উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছে। এই আলোচনা ও সিদ্ধান্তসমূহ নবগঠিত আসিয়ান-ভারত ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব (২০২৬–২০৩০)-এর লক্ষ্যের সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ।

এর আগে, গত ১৪ মে ব্রিকস (BRICS) বিদেশমন্ত্রীদের বৈঠকের ঠিক আগে নতুন দিল্লিতে ইন্দোনেশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সুগিয়োনোর সঙ্গে একটি প্রাথমিক বৈঠক করেছিলেন এস জয়শঙ্কর। সেই সাক্ষাতের পর সমাজমাধ্যম এক্স (X)-এ তিনি লিখেছিলেন, “ইন্দোনেশিয়ার বিদেশমন্ত্রী সুগিয়োনোকে স্বাগত জানাতে পেরে আনন্দিত। আমরা আমাদের ব্যাপক কৌশলগত অংশীদারিত্ব এবং আসিয়ানের সঙ্গে আমাদের সহযোগিতার অগ্রগতি পর্যালোচনা করেছি।”

এই উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকটি সুনিশ্চিত করছে যে, সাম্প্রতিক সময়ে দুই দেশের কূটনৈতিক স্তরে যে গতি তৈরি হয়েছে, তা যেন আগামী দিনে দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার স্থায়িত্ব এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে এক বাস্তব রূপ ধারণ করতে পারে।

Share This Article
Exit mobile version