উত্তর-পূর্ব ভারতে গত ২৫ বছরে বায়ু দূষণে মারাত্মক বৃদ্ধি

Sharp Rise In Air Pollution Across Northeast India Over Past 25 Years
Sharp Rise In Air Pollution Across Northeast India Over Past 25 Years (PC: Social Media Sites)

কয়েক দশক ধরে উত্তর-পূর্ব ভারত তার মনোরম পরিবেশ, ঘন জঙ্গল এবং পাহাড়ের বিশুদ্ধ বাতাসের জন্য পরিচিত ছিল। তবে, ২৫ বছরের দীর্ঘ এক স্যাটেলাইট ভিত্তিক গবেষণা এই সুন্দর ভাবমূর্তিটিকে বড় ধাক্কা দিয়েছে। কলকাতার বোস ইনস্টিটিউটের গবেষক অভিজিৎ চট্টোপাধ্যায় এবং সৌমেন রাউলের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় দেখা গেছে, গত এক শতাব্দীর এক-চতুর্থাংশে এই অঞ্চলে বায়ু দূষণ আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।

অ্যাটমোস্ফেরিক এনভায়রনমেন্ট (Atmospheric Environment) জার্নালে প্রকাশিত এই গবেষণায় ২০০০ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমি, হিমালয় অঞ্চল এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের দূষণের গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর ফলাফল একটি উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে: যা একসময় কেবল শিল্পোন্নত শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, তা এখন গ্রামীণ অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়েছে।

📈 পরিসংখ্যান: দূষণের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ

গবেষকরা দীর্ঘমেয়াদী তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছেন যে, উত্তর-পূর্ব ভারতে দূষণের মাত্রা সুনির্দিষ্ট দূষণকারীর ওপর ভিত্তি করে ২০% থেকে প্রায় ৫০% পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে।

  • দশকের ব্যবধানে বৃদ্ধি (২০১০-২০১৯): এই দশকে পার্টিকুলেট ম্যাটার (PM)-এর মাত্রা ২০০০ থেকে ২০০৯ সালের তুলনায় এক-পঞ্চমাংশ (২০%-এর বেশি) বৃদ্ধি পেয়েছিল।
  • ধোঁয়ার দাপট: অর্গানিক কার্বন অ্যারোসল—যা মূলত ধোঁয়া থেকে তৈরি হওয়া সূক্ষ্ম কণা—শতাব্দীর প্রথম দশকের তুলনায় প্রায় ৫০% বেড়ে গেছে।
  • ২০২০ পরবর্তী পরিস্থিতি: এই দূষণ ২০২০ সালের পরেও থামেনি, বরং ২০২৪ সালের মধ্যে কার্বন-ভিত্তিক দূষণ আরও ৩০% থেকে ৪০% বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই ধারাবাহিক বৃদ্ধির ফলে উত্তর-পূর্ব ভারতের এক বিশাল অংশ এখন আনুষ্ঠানিকভাবে “উচ্চ দূষণ” ক্যাটাগরির অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।

🗺️ দূষণের মানচিত্র: বিচ্ছিন্ন পকেট থেকে বিষাক্ত করিডোর

এই গবেষণার অন্যতম উদ্বেগজনক দিক হলো দূষণের ভৌগোলিক বিস্তার।

২০০০-এর দশকের শুরুতে, ভারী কার্বন দূষণ কেবল আসাম, মেঘালয় এবং ত্রিপুরার কিছু বিচ্ছিন্ন পকেটে সীমাবদ্ধ ছিল। বছরের পর বছর ধরে এই দূষণ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং অবশেষে একটি অবিচ্ছিন্ন ‘দূষণ করিডোরে’ পরিণত হয়, যা প্রতিবেশী রাষ্ট্র বাংলাদেশ এবং নিম্ন সিন্ধু-গাঙ্গেয় সমভূমির দূষিত বাতাসের সাথে সরাসরি যুক্ত হয়েছে।

যদিও গুয়াহাটির মতো প্রধান শহরগুলোতে PM2.5-এর মাত্রা জাতীয় নিরাপত্তা সীমার চেয়ে অনেক বেশি রেকর্ড করা হয়েছে, তবে এই সংকট এখন আর কেবল শহরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। স্যাটেলাইট ডাটা দেখাচ্ছে যে, দূষণ এখন গ্রামীণ এলাকা এবং পাহাড়ি উপত্যকাগুলোতেও বড় আকারে থাবা বসিয়েছে।

🪵 মূল কারণ: উত্তর ভারতের চেয়ে কেন আলাদা উত্তর-পূর্বের সংকট?

উত্তর ভারতে যেখানে দূষণের প্রধান কারণ শিল্প-কারখানা এবং যানবাহনের ধোঁয়া, সেখানে উত্তর-পূর্ব ভারতের ক্ষেত্রে গবেষকরা সম্পূর্ণ ভিন্ন কারণ চিহ্নিত করেছেন:

১. ঘরোয়া কাজে বায়োমাস (জ্বালানি কাঠ) পোড়ানো

এই অঞ্চলে দূষণ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় কারণ গ্রামীণ এলাকার মানুষের জীবনযাত্রার মৌলিক প্রয়োজন। লক্ষ লক্ষ গ্রামীণ পরিবার এখনো রান্নার কাজে এবং ঘর গরম রাখার জন্য জ্বালানি কাঠ, ঘুঁটে এবং অন্যান্য জৈব পদার্থের ওপর নির্ভরশীল।

২. জুম (Jhum) চাষের তীব্রতা বৃদ্ধি

পাহাড়ি অঞ্চলে জঙ্গল পুড়িয়ে চাষের ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতি বা ‘জুম চাষ’-এর প্রবণতা ইদানীং অনেক বেড়ে গেছে। এর ফলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে বাতাসে ব্যাপক হারে ধোঁয়া এবং কার্বন কণা ছড়িয়ে পড়ে।

৩. ভৌগোলिक অবস্থান এবং বায়ুপ্রবাহ

উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিজেই যেমন দূষণ তৈরি করছে, তেমনি বাইরে থেকে আসা দূষণেরও শিকার হচ্ছে। ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া বাতাস পশ্চিমবঙ্গ এবং বিহারের মতো শিল্পপ্রধান রাজ্যগুলো থেকে সালফেট এবং কার্বন নির্গমনকে উড়িয়ে এনে এই অঞ্চল এবং পূর্ব হিমালয় বলয়ে জমা করে।

🚨 নীতিগত দুর্বলতা: কেন ব্যর্থ হচ্ছে বর্তমান পরিকল্পনা?

গবেষণাটি ভারতের বর্তমান পরিবেশ নীতিমালার একটি বড় খামতিকে সামনে এনেছে। বর্তমানে, দেশের প্রধান বায়ুশোধন কর্মসূচি—ন্যাশনাল ক্লিন এয়ার প্রোগ্রাম (NCAP)—কেবল মাত্র ১৩-টি নির্দিষ্ট শহরের ওপর নজর দেয়।

যেহেতু বর্তমান নীতিগুলো সম্পূর্ণ শহর-কেন্দ্রিক, তাই গ্রামীণ অঞ্চলের বায়োমাস পোড়ানো এবং জুম চাষের ধোঁয়াকে এগুলো সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে। ফলস্বরূপ, উত্তর-পূর্বের এক বিশাল অংশ যেকোনো সক্রিয় সরকারি নজরদারি বা বায়ু-মান উন্নয়ন কর্মসূচির বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

📋 ভবিষ্যৎ করণীয়: পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল এলাকাকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি

গবেষকরা সতর্ক করেছেন যে, গ্রামীণ এবং পরিবেশগতভাবে সংবেদনশীল (ecologically sensitive) অঞ্চলগুলোকে যদি এভাবে বাদ দেওয়া হতে থাকে, তবে দেশের পরিবেশ নীতিগুলো বায়ু দূষণ নিয়ন্ত্রণে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হবে।

এই সংকট মোকাবিলায় গবেষকরা অবিলম্বে NCAP-এর পরিধি বাড়ানোর জোর সুপারিশ করেছেন। তাঁরা নীতি-নির্ধারকদের শুধু শহরের গণ্ডিতে আটকে না থেকে গ্রামীণ এলাকা, সমগ্র উত্তর-পূর্বাঞ্চল, হিমালয় অঞ্চল এবং সুন্দরবনের মতো সংবেদনশীল এলাকাগুলোকে জাতীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার আওতায় আনার আহ্বান জানিয়েছেন।

Share This Article
Exit mobile version