ডিজিটাল বিপ্লবের অন্ধকার দিক: স্মার্টফোনের গ্রাসে হারাচ্ছে মনোযোগ, বিপন্ন ভারতীয় সমাজ ও যুবসমাজ

Digital Addiction Social Media Dependence
Digital Addiction Social Media Dependence (PC: Social Media Sites)

নয়াদিল্লি — মানব ইতিহাসের অন্যতম দ্রুততম ডিজিটাল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে আজকের ভারত। সস্তা মোবাইল ডাটা, কমদামী স্মার্টফোন এবং ডিজিটাল পেমেন্টের সহজলভ্যতা দেশের শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রামে দৈনন্দিন জীবনকে বদলে দিয়েছে। কিন্তু এই অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়নের সমান্তরালে, অত্যন্ত নিঃশব্দে এক মারাত্মক মনস্তাত্ত্বিক সংকট দানা বাঁধছে। এই সংকট হলো—ক্রমাগত মনোযোগের অভাব, ডিজিটাল নির্ভরতা এবং মানসিক একাকীত্ব।

আসক্তির মনস্তত্ত্ব ও টেক জায়ান্টদের কৌশল

ডিজিটাল ২০২৫: ইন্ডিয়া-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ভারতে বর্তমানে ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা ৮০ কোটিরও বেশি, যার মধ্যে প্রায় ৫০ কোটি মানুষ সোশ্যাল মিডিয়ায় সক্রিয়। আজ স্মার্টফোন মানুষের জীবনের এমন এক অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে যে, পকেটে ফোন না থাকলে মানুষ তীব্র অস্বস্তি বোধ করে।

আসলে মানুষের মস্তিষ্ক অনবরত ডিজিটাল উদ্দীপনা বা স্টিমুলেশন নেওয়ার জন্য তৈরি নয়। কিন্তু আধুনিক অ্যাপগুলির অ্যালগরিদম এমনভাবে সাজানো হয়েছে যা ব্যবহারকারীকে স্ক্রিনে ধরে রাখতে বাধ্য করে। ‘ইনফিনিট স্ক্রোলিং’ (যা শেষ হয় না), অটো-প্লে ভিডিও এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চালিত নোটিফিকেশন মানুষের অবচেতন মনকে নিয়ন্ত্রণ করছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) স্পষ্ট ভাষায় সতর্ক করেছে যে, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্য, ঘুমের চক্র এবং সামাজিক বিকাশের অপূরণীয় ক্ষতি করছে।

শিক্ষাক্ষেত্রে মারাত্মক বিপর্যয়

এই ডিজিটাল আসক্তির সবচেয়ে বড় শিকার হচ্ছে বর্তমান ছাত্র সমাজ। শিক্ষক ও অধ্যাপকদের অভিজ্ঞতা অনুযায়ী, ক্লাসরুমে পড়ুয়াদের মনোযোগের গ্রাফ দ্রুত নামছে। কোনো একটি জটিল বিষয় ধৈর্য ধরে বোঝার মানসিকতা হারিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ পাঠ্যবই বা গবেষণাপত্র পড়ার চেয়ে ছাত্ররা ইন্টারনেটে চটজলদি সংক্ষিপ্ত উত্তর খুঁজতেই বেশি পছন্দ করে।

এর ফলে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে যে বিষয়গুলো হ্রাস পাচ্ছে:

  • গভীর পড়াশোনা এবং অ্যাকাডেমিক একাগ্রতা।
  • বিশ্লেষণাত্মক ও স্বাধীন চিন্তাভাবনা।
  • নতুন কিছু জানার কৌতূহল এবং বুদ্ধিবৃত্তিক সহনশীলতা।

এমনকি ল্যাবরেটরি বা প্র্যাক্টিক্যাল ক্লাসের মতো গুরুত্বপূর্ণ সময়েও ছাত্ররা ফোনের নোটিফিকেশন চেক করতে ব্যস্ত থাকছে।

ঘরোয়া ও সামাজিক সম্পর্কের অবক্ষয়

স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার ভারতীয় যৌথ ও পারিবারিক সংস্কৃতির ওপর বড় আঘাত হেনেছে। আগেকার দিনে যে সন্ধেগুলো আড্ডা, খেলাধুলো বা বই পড়ার মধ্য দিয়ে কাটত, এখন সেখানে শুধুই নিস্তব্ধতা। একই ঘরের মধ্যে বসেও পরিবারের প্রতিটি সদস্য আলাদা আলাদা স্ক্রিনে মগ্ন। এমনকি খাওয়ার টেবিলেও ফোনের ব্যবহার বন্ধ হচ্ছে না। চিকিৎসকদের মতে, খাওয়ার সময় সম্পূর্ণ মনোযোগ খাবারের দিকেই থাকা উচিত, অন্যথায় শরীর খাদ্যের পুষ্টিগুণ সম্পূর্ণ গ্রহণ করতে পারে না।

একই দৃশ্য দেখা যায় বাস, ট্রেন, বিমানবন্দর বা রেস্তোরাঁর মতো পাবলিক প্লেসেও। উৎসব-অনুষ্ঠানেও মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ কমছে। মানুষ এখন মুহূর্তটি উপভোগ করার চেয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় তা লাইভ বা পোস্ট করার জন্য ভিডিও রেকর্ডিং করতেই বেশি ব্যস্ত থাকে।

সমাধানের পথ এবং ‘ডিজিটাল প্রজ্ঞা’

সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রবণতা হলো, অনেক অভিভাবকই আজকাল শিশুদের শান্ত রাখতে বা খাবার খাওয়ানোর সময় তাদের হাতে ফোন তুলে দিচ্ছেন। সাময়িক স্বস্তির জন্য নেওয়া এই পদক্ষেপ দীর্ঘমেয়াদে শিশুর মানসিক ও আবেগীয় বিকাশকে পঙ্গু করে দিচ্ছে।

এই পরিস্থিতি থেকে বাঁচতে সমাজকে ‘ডিজিটাল প্রজ্ঞা’ বা ‘ডিজিটাল উইজডম’ অর্জন করতে হবে:

  • পারিবারিক শৃঙ্খলা: খাওয়ার সময়, পড়াশোনার সময় এবং ঘুমানোর আগে পারিবারিক স্তরে ‘নো স্মার্টফোন’ সময় বা জোন তৈরি করতে হবে।
  • শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সিলেবাসের পড়াশোনার পাশাপাশি ডিজিটাল সুস্থতা এবং পরিমিত স্ক্রিন টাইম নিয়ে সচেতনতা পাঠ বাধ্যতামূলক করা দরকার।
  • করপোরেট দায়বদ্ধতা: প্রযুক্তি সংস্থাগুলিকে শুধু বিজ্ঞাপনের রাজস্ব না দেখে এমন অ্যাপ ডিজাইন করতে হবে যা সুস্থ ডিজিটাল অভ্যাস ও বিরতি নিতে উৎসাহিত করে।

প্রযুক্তি কোনো শত্রু নয়; কোভিড মহামারির সময়ে এই প্রযুক্তিই দূরশিক্ষণ ও ঘরে বসে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছিল। সমস্যা প্রযুক্তিতে নয়, সমস্যা তার অনিয়ন্ত্রিত ও অর্থহীন ব্যাবহারে। ভারতের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ যেন মানুষের মানসিক ভারসাম্য এবং সামাজিক বন্ধনের বিনিময়ে না আসে, তা নিশ্চিত করার সময় এসেছে।

Share This Article
Exit mobile version