সিলিকন ভ্যালি:
বিশ্বের তাবড় তাবড় গণিতবিদদের চমকে দিয়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের (AI) ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও যুগান্তকারী রেকর্ড তৈরি হলো। চ্যাটজিপিটি (ChatGPT) নির্মাতা সংস্থা ওপেনএআই (OpenAI) দাবি করেছে যে, তাদের একটি অপ্রকাশিত এবং অত্যন্ত শক্তিশালী ‘রিজনিং এআই মডেল’ (Reasoning Model) সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে একটি জটিল গাণিতিক সমস্যার সমাধান করেছে। এই ধাঁধাটি আজ থেকে ঠিক ৮০ বছর আগে, ১৯৪৬ সালে বিখ্যাত হাঙ্গেরিয়ান গণিতবিদ পল এরডস (Paul Erdős) প্রথম দুনিয়ার সামনে এনেছিলেন।
বিজ্ঞানের ইতিহাসে এটিই প্রথম ঘটনা, যেখানে কোনো এআই সিস্টেম কোনো মানুষের সাহায্য ছাড়াই, নিজের গভীর যুক্তি ক্ষমতা ব্যবহার করে খাঁটি গণিতের (Pure Mathematics) একটি ঐতিহাসিক অমীমাংসিত গবেষণার সম্পূর্ণ নতুন এবং নিখুঁত প্রমাণ (Original Proof) তৈরি করতে পেরেছে।
সহজ ভাষায় কী ছিল এই কঠিন ধাঁধাটি?
১৯৪৬ সালে পল এরডস যে জ্যামিতিক প্রশ্নটি করেছিলেন, তা শুনতে খুব সহজ মনে হয়:
“ধরা যাক, আপনি একটা কাগজের ওপর বেশ কিছু বিন্দু (Dots) আঁকলেন। এই বিন্দুগুলিকে আপনি কীভাবে সাজালে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক এমন জোড়া (Pairs) তৈরি করা সম্ভব, যাদের পারস্পরিক দূরত্ব একেবারে সমান বা নির্দিষ্ট (Unit Distance) হবে?”
গত আট দশক ধরে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞরা বিশ্বাস করতেন যে, এর একমাত্র সেরা সমাধান হলো একটি সোজা ‘স্কয়ার গ্রিড’ বা চৌকো জালের মতো কাঠামো। এরডস নিজেও ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে এই গ্রিড ব্যবস্থার বাইরে আর কোনো ভালো জ্যামিতিক নকশা তৈরি করা অসম্ভব, এবং তিনি এই জটিল ধাঁধার সমাধানকারীর জন্য নগদ পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন।
কিন্তু ওপেনএআই-এর নতুন মডেল মানুষের সেই ৮০ বছরের বিশ্বাসকে ভুল প্রমাণ করে দিয়েছে। ১২৫ পাতার একটি সম্পূর্ণ নিজস্ব লজিক্যাল চেইনের মাধ্যমে এআই প্রমাণ করেছে যে, স্কয়ার গ্রিডের চেয়েও অনেক উন্নত একটি জ্যামিতিক নকশা মহাবিশ্বে সম্ভব। এআই মডেলটি বীজগণিত এবং মৌমাছির চাকের মতো ত্রিকোণাকার হনিকম্ব (Honeycomb) প্যাটার্ন ব্যবহার করে এমন এক নতুন বিন্দুর বিন্যাস আবিষ্কার করেছে, যা মানুষের ভাবনার চেয়ে বহুগুণ বেশি সমান দূরত্বের সংযোগ তৈরি করতে পারে।
খোদ কেমব্রিজের গণিতবিদরা দিলেন সিলমোহর
ওপেনএআই-এর এই সাফল্য নিয়ে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তৈরি হওয়ার আরও একটি বড় কারণ হলো তাদের অতীত রেকর্ড। গত বছর ওপেনএআই-এর এক শীর্ষ কর্তা তড়িঘড়ি দাবি করেছিলেন যে তাদের জিপিটি মডেল এরডসের একাধিক ধাঁধা সমাধান করেছে, কিন্তু পরবর্তীতে মেটার (Meta) ইয়ান লেকুন এবং ডিপমাইন্ডের ডেমিস হাসাবিসের মতো বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেন যে এআই কোনো নতুন আবিষ্কার করেনি, বরং ইন্টারনেটে থাকা পুরনো গবেষণাপত্রই কপি-পেস্ট করেছিল।
তবে এবার ওপেনএআই কোনো ফাঁক রাখেনি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ডস মেডেল বিজয়ী বিখ্যাত গণিতবিদ টিমোথি গোভার্স এবং প্রিন্সটনের উইল সাভিনের মতো বিশ্বখ্যাত বিশেষজ্ঞরা এই ১২৫ পাতার এআই-রচিত গবেষণাপত্রটি পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা করে এটিকে সম্পূর্ণ সঠিক এবং এক ঐতিহাসিক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
কেন এই আবিষ্কার বিজ্ঞানের মোড় ঘুরিয়ে দেবে?
ওপেনএআই স্পষ্ট করেছে যে, এই অসাধ্য সাধনের জন্য তারা কোনো বিশেষ গাণিতিক ক্যালকুলেটর বা অলিম্পিয়াডের সফটওয়্যার ব্যবহার করেনি। এটি একটি সাধারণ যৌক্তিক বুদ্ধিমত্তার মডেল (General-purpose Reasoning Model), যা মানুষের মতো বিভিন্ন বিষয়ের আইডিয়াকে একসাথে জুড়ে দীর্ঘ জটিল চিন্তা করতে পারে।
বিজ্ঞানীদের মতে, যে এআই আজ জ্যামিতির এই রহস্য নিজের বুদ্ধিতে ভেদ করতে পেরেছে, খুব শীঘ্রই সেই একই মেধা ব্যবহার করে সে জীববিজ্ঞানের জটিল প্রোটিন গঠন, কোয়ান্টাম ফিজিক্সের জটিল সমীকরণ সমাধান, সুপার-ফাস্ট কম্পিউটার চিপের সার্কিট ডিজাইন এবং আধুনিক রোবোটিক্সের নকশা তৈরি করতে পারবে।

