আধুনিক এয়ার কন্ডিশনারের সম্পূর্ণ ইতিহাস ও বিবর্তন

Willis Carrier (center) At The Magna Mine A C System, July 17, 1902. The Centrifugal Compressor He Pioneered Made Large Scale Air Conditioning Feasible For The First Time.
Willis Carrier (center) At The Magna Mine A C System, July 17, 1902. The Centrifugal Compressor He Pioneered Made Large Scale Air Conditioning Feasible For The First Time. (PC: Social Media Sites)

মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করার বহু আগে থেকেই মানুষ গরম থেকে বাঁচার উপায় খুঁজছিল। প্রাচীন রোমের ধনী ব্যক্তিরা তাদের প্রাসাদের দেয়ালের ভেতর দিয়ে ঠাণ্ডা পানির নালা (aqueducts) প্রবাহিত করত। মধ্যযুগীয় পারস্যে (বর্তমান ইরান) প্রকৌশলীরা মরুভূমির বাতাসকে মাটির নিচে ঠাণ্ডা পানির কুন্ডের ওপর দিয়ে ঘরের ভেতর আনার জন্য উচুঁ বাদগির (উইন্ড ক্যাচার বা বাতাস ধরার মিনার) তৈরি করেছিলেন। তবে এই প্রাচীন পদ্ধতিগুলোর কোনোটিই বাতাসের আর্দ্রতা (humidity) কমাতে পারত না—যা মূলত গরমের দিনে আমাদের অস্বস্তির আসল কারণ।

১৯০২: ছাপাখানার সমস্যা এবং এয়ার কন্ডিশনারের জন্ম

আধুনিক এয়ার কন্ডিশনারের ইতিহাস শুরু হয় ১৯০২ সালে নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনের ‘স্যাকো-উইলহেমস লিথোগ্রাফিং অ্যান্ড পাবলিশিং কোম্পানি’ নামের একটি ছাপাখানায়। গ্রীষ্মকালে অতিরিক্ত আর্দ্রতার কারণে সেখানে রঙিন ছপাকাজ করা অসম্ভব হয়ে পড়েছিল। বাতাসের আর্দ্রতার তারতম্যের কারণে কাগজ কখনো সংকুচিত হতো, কখনো প্রসারিত হতো। ফলে এক রঙের ওপর অন্য রঙের কালির ছাপগুলো নিখুঁতভাবে বসছিল না এবং পুরো প্রিন্টিং নষ্ট হচ্ছিল।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য নিয়োগ দেওয়া হয় ২৫ বছর বয়সী তরুণ প্রকৌশলী উইলিস হ্যাভিল্যান্ড ক্যারিয়ার (Willis Haviland Carrier)-কে। ক্যারিয়ার বাতাস ঠাণ্ডা করার চেয়ে বাতাসের আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি জোর দেন। তিনি এমন একটি যন্ত্র তৈরি করেন যা ঠাণ্ডা পানি ভর্তি পাইপের ওপর দিয়ে গরম বাতাস প্রবাহিত করত। গরম বাতাস যখন অত্যন্ত ঠাণ্ডা পাইপের সংস্পর্শে আসত, তখন বাতাসের জলীয় বাষ্প ঘনীভূত (condense) হয়ে পাইপের গায়ে পানির ফোঁটা হিসেবে জমা হতো এবং নিচে পড়ে যেত—ঠিক যেভাবে একটি বরফ ঠাণ্ডা পানির গ্লাসের গায়ে বাইরে থেকে জলকণা জমে।

এই যন্ত্রটির মাধ্যমে দুটি কাজ সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছিল: ১. ঘরের ভেতরের আর্দ্রতা ঠিক ৫৫ শতাংশে ধরে রাখা সম্ভব হয়েছিল। ২. এর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া (side-effect) হিসেবে ঘরের তাপমাত্রাও এক ধাক্কায় অনেক কমে গিয়েছিল।

ক্যারিয়ার বুঝতে পেরেছিলেন যে এই আবিষ্কারের ভবিষ্যৎ বিশাল। তিনি দ্রুত নিজের কোম্পানি প্রতিষ্ঠা করেন এবং টেক্সটাইল মিল, ময়দার মিল, চকোলেট ফ্যাক্টরি এবং বারুদ তৈরির কারখানায় এই যন্ত্র বিক্রি শুরু করেন, যেখানে আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণ ছিল অত্যন্ত জরুরি।

১৯২০-এর দশক: মানুষের আরামের জন্য বাণিজ্যিক যাত্রা

প্রথম দিকের শিল্পক্ষেত্রের এসিগুলো ছিল বিশাল এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক। সেগুলোতে রেফ্রিজারেন্ট (ঠাণ্ডা করার গ্যাস) হিসেবে বিষাক্ত অ্যামোনিয়া, সালফার ডাই অক্সাইড এবং দাহ্য প্রোপেন গ্যাস ব্যবহার করা হতো। পাইপ ফুটো হয়ে এই গ্যাস ছড়িয়ে পড়লে মানুষের মৃত্যুর ঝুঁকি থাকত। তাই সাধারণ মানুষের জায়গায় এটি ব্যবহারের উপযোগী ছিল না।

মানুষের আরামের জন্য এসির ব্যবহার শুরু হয় ১৯২২ সালে, যখন ক্যারিয়ার সেন্ট্রিফিউগাল রেফ্রিজারেশন কম্প্রেসর আবিষ্কার করেন। এই নতুন যন্ত্রটি আকারে ছোট ছিল এবং এতে ‘ডাইলিন’ (Dielene) নামক একটি নিরাপদ ও অবিষাক্ত তরল কুল্যান্ট ব্যবহার করা হয়েছিল।

এই ব্যয়বহুল প্রযুক্তি বাজারজাত করার জন্য ক্যারিয়ার বেছে নেন সিনেমা হলগুলোকে। ১৯২০-এর দশকে চরম গরমের কারণে জুলাই ও আগস্ট মাসে সিনেমা হলগুলো বন্ধ রাখতে হতো, কারণ শত শত মানুষের শরীরের গরমে হলের ভেতরের অবস্থা চুল্লির মতো হয়ে যেত। ১৯২৫ সালের গ্রীষ্মে নিউ ইয়র্কের রিভোলি থিয়েটারে (Rivoli Theater) প্রথমবার ক্যারিয়ারের এই এসি সিস্টেম স্থাপন করা হয়। হলের বাইরে বড় বড় বোর্ডে “বরফ শীতল ঠাণ্ডা বাতাস”-এর বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এই পরীক্ষাটি রাতারাতি আলোড়ন সৃষ্টি করে। মানুষ সিনেমা দেখার চেয়ে গরম থেকে বাঁচতেই থিয়েটারের টিকিট কাটা শুরু করে। এই বিপুল জনপ্রিয়তার হাত ধরেই হলিউডে “সামার ব্লকবাস্টার” বা গরমের ছুটির বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তির ট্রেন্ড শুরু হয়।

১৯৩০-১৯৫০-এর দশক: ছোট আকার এবং গৃহস্থালিতে প্রবেশ

গণমানুষের কাছে এসি পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল নিরাপদ গ্যাস। ১৯২৮ সালে থমাস মিডগ্লি জুনিয়র আবিষ্কার করেন ফ্রেয়ন (Freon – CFC) গ্যাস। এই গ্যাসটি ছিল সম্পূর্ণ অগ্নিনিরোধক এবং মানুষের শরীরের জন্য শতভাগ নিরাপদ।

নিরাপদ গ্যাস আবিষ্কারের পর প্রকৌশলীরা এসির যন্ত্রাংশ ছোট করার প্রতিযোগিতায় নামেন। ১৯৩১ সালে ‘এইচ.এইচ. শুল্টজ’ এবং ‘জে.কিউ. শারম্যান’ প্রথম উইন্ডো এসির (Window AC) পেটেন্ট বা স্বত্ব লাভ করেন। তবে প্রথম দিকে অত্যন্ত চড়া দামের কারণে এটি কেবল কোটিপতিদের বিলাসিতার বস্তু ছিল।

সাধারণ মানুষের ঘরে এসির প্রবেশ ঘটে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে কারখানায় উৎপাদন খরচ কমে আসায় ১৯৪৭ সালের মধ্যে সাশ্রয়ী মূল্যের উইন্ডো এসি বাজারে আসে। ১৯৫৩ সালের মধ্যে কেবল আমেরিকাতেই বছরে ১০ লক্ষাধিক গৃহস্থালি এসি বিক্রি হতে শুরু করে।

এসি যেভাবে পৃথিবীর ভূগোল ও স্থাপত্য বদলে দিল

  • জনসংখ্যার স্থানান্তর: এসি আবিষ্কারের আগে আমেরিকার দক্ষিণ ও পশ্চিমাঞ্চলীয় মরুভূমি এলাকাগুলো (যেমন ফিনিক্স, লাস ভেগাস, মায়ামি) অতিরিক্ত গরমের কারণে প্রায় জনশূন্য ছিল। এসির কল্যাণে এই শহরগুলো আজ বিশ্বের অন্যতম জনবহুল ও অর্থনৈতিক মেগাসিটিতে পরিণত হয়েছে।
  • স্থাপত্যের পরিবর্তন: প্রাচীনকাল থেকেই ঘর ঠাণ্ডা রাখার জন্য উঁচু ছাদ, চারদিকে খোলা বারান্দা এবং মোটা ইটের দেয়াল তৈরি করা হতো। সেন্ট্রাল এসি আসার পর স্থাপত্যের এই নিয়ম পুরোপুরি বদলে যায়। এর ফলে কাঁচের তৈরি বহুতল ভবন এবং নিচু ছাদের আধুনিক ফ্ল্যাট কালচারের জন্ম হয়।
  • বৈশ্বিক নগরায়ন: এই প্রযুক্তির ওপর ভর করেই পরবর্তীতে সিঙ্গাপুর, হংকং, দুবাই এবং মুম্বাইয়ের মতো গ্রীষ্মমন্ডলীয় অঞ্চলের শহরগুলো বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্রে রূপান্তরিত হতে পেরেছে, যেখানে এসি ছাড়া দৈনন্দিন জীবনযাত্রা স্থবির হয়ে পড়বে।
Share This Article
Exit mobile version