দিল্লির জন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির (CJP) ব্যানারে শত শত ছাত্র ও অভিভাবক নিট (NEET 2026) ও সিবিএসই পরীক্ষা দুর্নীতির বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে সরব হলেন।
নয়াদিল্লি — সোশ্যাল মিডিয়ার ব্যঙ্গচিত্র থেকে সরাসরি রাজপথের রাজনৈতিক আন্দোলনে রূপ নিয়ে, শনিবার দিল্লির জন্তর মন্তরে সমবেত হলেন শত শত যুবক, ছাত্র এবং অভিভাবক। ককরোচ জনতা পার্টি (CJP)-র ব্যানারে আয়োজিত এই বিক্ষোভের মূল লক্ষ্য ছিল জাতীয় পরীক্ষা কাঠামোয় প্রশাসনিক ব্যর্থতা এবং দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনার প্রতিবাদ করা। আন্দোলনের মূল দাবি ছিল কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ।
এই বিক্ষোভটি সেই আন্দোলনের প্রথম বাস্তব রূপ যা মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে শুরু হয়েছিল। মিডিয়াতে সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতি সূর্যকান্তের একটি কথিত মন্তব্য (যেখানে তিনি বেকার যুবকদের “তেলাপোকা” বা ককরোচের সাথে তুলনা করেছিলেন বলে দাবি করা হয়) ভুল প্রসঙ্গে ভাইরাল হওয়ার পর, CJP এই শব্দটিকে নিজেদের প্রতিবাদের প্রতীক করে তোলে। অত্যন্ত দ্রুত গতিতে ডিজিটাল দুনিয়ায় নিজেদের পায়ের তলার মাটি শক্ত করে এই দল ইনস্টাগ্রামে ২২ মিলিয়নেরও (২.২ কোটি) বেশি ফলোয়ার অর্জন করেছে—যা শাসক দল ভারতীয় জনতা পার্টির (BJP) মূল হ্যান্ডেলের চেয়েও বেশি।
মূল সমস্যাগুলি কী কী?
পরিস্থিতি পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, জন্তর মন্তরে বিক্ষোভকারী যুবকদের এই ক্ষোভের পিছনে রয়েছে দেশের ১ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থীকে প্রভাবিত করা একাধিক পরীক্ষা সংক্রান্ত সংকট:
- NEET-UG 2026 প্রশ্ন ফাঁস: মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষায় দেশজুড়ে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অকাট্য প্রমাণ সামনে আসার পর প্রায় ২২ লক্ষ পরীক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে, যা নিয়ে দেশজুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
- CBSE অন-স্ক্রিন মার্কিং (OSM) বিপর্যয়: দ্বাদশ শ্রেণীর পরীক্ষার মূল্যায়নের জন্য কেন্দ্রীয় মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ডের (CBSE) নতুন “COEMPT On Mark” পোর্টালে কারিগরি ত্রুটির কারণে শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে। বিরোধীরা সিবিএসই চেয়ারম্যান ও সচিবের বদলিকে স্রেফ “আইওয়াশ” বা লোকদেখানো পদক্ষেপ বলে কটাক্ষ করেছেন।
- CUET এবং SSC-GD বিভ্রাট: কমন ইউনিভার্সিটি এন্ট্রান্স টেস্ট (CUET) এবং স্টাফ সিলেকশন কমিশন জেনারেল ডিউটি (SSC-GD) নিয়োগ প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও বড় ধরনের পরিকাঠামোগত গাফিলতি সামনে এসেছে।
জন্তর মন্তরে বিক্ষোভ: ঠিক কী ঘটেছিল
CJP-র প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে শনিবার সকালে আমেরিকার বোস্টন থেকে বিমানে নতুন দিল্লি পৌঁছান। ভারতে নামার সাথে সাথেই পুলিশ তাঁকে আটক করতে পারে বলে পরিবারের আশঙ্কার মাঝেই, দিপকে দিল্লি পুলিশের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়ে পার্লামেন্ট স্ট্রিটের বিক্ষোভস্থলে পৌঁছান।
জন্তর মন্তরের পরিবেশ ছিল অভিনব রাজনৈতিক ব্যঙ্গ এবং অত্যন্ত সুশৃঙ্খল সাংবিধানিক প্রতিবাদের এক অপূর্ব মিশ্রণ:
- মাস্ক বিতরণ: আগত শত শত ছাত্র এবং অভিভাবকরা অনুষ্ঠানস্থলে বিতরণ করা ককরোচের মুখোশ (মাস্ক) পরে বিক্ষোভে অংশ নেন।
- স্লোগান ও কর্মসূচি: বিক্ষোভকারীরা “ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা দাও” স্লোগান তোলেন এবং হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, যাতে লেখা ছিল— “আমরা চেয়েছিলাম ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, আপনারা দিলেন ‘লিক ইন ইন্ডিয়া'”। এক্স (টুইটার)-এ দিপকের পূর্ব নির্দেশ মেনে আন্দোলনকারীরা সাথে জাতীয় পতাকা (তিরঙ্গা) এবং পাঠ্যবই নিয়ে এসেছিলেন, এবং কর্তব্যরত পুলিশকর্মীদের ভালোবাসার প্রতীক হিসেবে ফুল উপহার দেন।
- দলমত নির্বিশেষে নাগরিক সমাজের সংহতি: এই আন্দোলন বিভিন্ন মতাদর্শের গোষ্ঠীকে এক মঞ্চে নিয়ে আসতে সফল হয়েছে। যুবসমাজের এই প্রতিবাদে সংহতি জানাতে যোগ দেন পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক, জেএনইউ ছাত্র সংসদের সভাপতি অদিতি মিশ্র, সিপিআই (এমএল) লিবারেশনের সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য এবং সিপিআই নেত্রী অ্যানি রাজা।
বিক্ষুব্ধ জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখার সময় দিপকে সোশ্যাল মিডিয়ায় কেন্দ্র সরকারের অ্যাকাউন্ট সেন্সরশিপ ও দমননীতির তীব্র সমালোচনা করেন:
“বন্ধুরা, এটি একটি দীর্ঘ লড়াই। সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রধানের পদত্যাগের দাবি জানানোর এক মাস হয়ে গেছে, কিন্তু এই লোকগুলো এতটাই নির্লজ্জ যে ব্যবস্থা নেওয়ার বদলে তারা আমাদের অ্যাকাউন্ট হ্যাক করতে এবং আমাদের পোস্ট মুছে দিতে ব্যস্ত। আপনারা আমাদের পোস্ট মুছে দিতে পারেন, কিন্তু আমাদের এই লড়াইয়ের ময়দান থেকে মুছে ফেলতে পারবেন না। এই দেশের ছাত্র ও যুবসমাজ বিক্রি হয়ে যায়নি (লেকিন ইস দেশ কা ছাত্র, যুবা নহি বিকা হ্যায়)।”
দিপকে বর্তমান রাজনৈতিক ধারাকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন তোলেন, গত ১০-১২ বছরের এই “হিন্দু-মুসলিম” সাম্প্রদায়িক রাজনীতি দেশের লড়াই করা যুবসমাজের জন্য কোনো কর্মসংস্থান বা স্থায়ী জীবিকার সুযোগ তৈরি করতে পেরেছে কিনা।
আন্দোলনের ফলাফল এবং আগামী দিনের রূপরেখা
- শান্তিপূর্ণ সমাপ্তি: এই বিশাল সমাবেশ কোনো রকম সহিংসতা বা আইনশৃঙ্খলার অবনতি ছাড়াই শান্তিপূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। দিল্লি পুলিশ পরে স্পষ্ট জানিয়েছে যে মূল বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো এফআইআর (FIR) দায়ের করা হয়নি।
- সতর্কতামূলক আটক: অনুষ্ঠানস্থলের কাছ থেকে নিরাপত্তা বাহিনী ছয়জনকে সাময়িকভাবে আটক করে। আধিকারিকরা নিশ্চিত করেছেন যে এই পদক্ষেপটি সম্পূর্ণ সতর্কতামূলক ছিল, যাতে CJP সমর্থক এবং একটি ছোট বিরোধী গোষ্ঠীর মধ্যে কোনো রকম সংঘর্ষ না ঘটে।
- সাত দিনের আলটিমেটাম: CJP-র নবনিযুক্ত মুখপাত্র—সৌরভ দাস, বিজেতা দাহিয়া এবং আশুতোষ রাঙ্কার মাধ্যমে এই আন্দোলন কেন্দ্র সরকারকে সাত দিনের সময়সীমা (আলটিমেটাম) বেঁধে দিয়েছে। CJP সতর্ক করেছে যে, ধর্মেন্দ্র প্রধান যদি এক সপ্তাহের মধ্যে পদত্যাগ না করেন, তবে তারা জন্তর মন্তরের এই আন্দোলনকে দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনে রূপ দেবে।
- বিরোধী জোটে ফাটল: বামপন্থী এবং আঞ্চলিক বিরোধী দলগুলি এই যুব আন্দোলনকে সমর্থন করলেও, প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেস এই বিষয়ে প্রকাশ্যে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখেছে। এর ফলে CJP-র এই আকস্মিক উত্থানকে কীভাবে মোকাবিলা করা হবে, তা নিয়ে বিরোধী জোটের অন্দরে কৌশলগত মতভেদ স্পষ্ট হয়েছে।

