ভারতে লঞ্চ হলো E85 পেট্রোল: দাম, অসুবিধা, ফ্লেক্স-ফুয়েল গাড়ি এবং ইথানল প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলির সম্পূর্ণ তথ্য

E85 Petrol Launched In India, 85% Ethanol With 15% Conventional Petrol
E85 Petrol Launched In India, 85% Ethanol With 15% Conventional Petrol (PC: Social Media Sites)

ভারতে E85 পেট্রোল প্রতি লিটার ₹৮২.১২ দামে লঞ্চ করা হয়েছে। জানুন এর উপাদান, সরকারের এই পদক্ষেপের আসল কারণ, কোন কোম্পানিগুলি ইথানল সরবরাহ করছে এবং গাড়ির ক্ষেত্রে এর প্রধান অসুবিধাগুলি কী কী।

ভারত কেন E85 ইন্ধন চালুর পদক্ষেপ নিল?

কেন্দ্রীয় সরকার মূলত তিনটি বড় জাতীয় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে দেশে E85 জ্বালানি চালু করার প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করেছে:

১. আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের অস্থিরতা থেকে রক্ষা: বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং অপরিশোধিত তেলের দামের আকস্মিক ওঠানামা থেকে ভারতের সাধারণ গ্রাহকদের পকেটকে সুরক্ষিত রাখা।

২. কৃষকদের আর্থিক উন্নতি ও বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়: বিদেশ থেকে অপরিশোধিত তেল আমদানির পেছনে যে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় হয়, তা বাঁচিয়ে সরাসরি দেশের গ্রামীণ অর্থনীতিতে বিনিয়োগ করা। দেশের অন্তত ৫০% নতুন গাড়িও যদি ফ্লেক্স-ফুয়েলে চলে, তবে প্রায় ১২,৪০৩ কোটি টাকা সরাসরি ভারতের কৃষক সমাজের কাছে পৌঁছাবে।

৩. কার্বন নির্গমন হ্রাস: প্রচলিত সাধারণ পেট্রোলের তুলনায় E85 জ্বালানি গ্রীনহাউস গ্যাসের নির্গমন প্রায় ৬১% পর্যন্ত কমিয়ে দেয়। এর অকটেন নম্বর অত্যন্ত বেশি (~108 RON) হওয়ায় ইন্ধন সম্পূর্ণভাবে দহন হয়, ফলে ক্ষতিকারক ধোঁয়া বা দূষণ একেবারেই হয় না।

এই ইথানল কোথা থেকে আসছে এবং এর সরবরাহকারী কারা?

জীবাশ্ম জ্বালানির মতো এটি আমদানিকৃত নয়, ভারতের এই ফুয়েল-গ্রেড ইথানল সম্পূর্ণভাবে দেশীয় কৃষিজাত পণ্য থেকে তৈরি করা হচ্ছে। এটি মূলত নিম্নলিখিত উপাদানগুলি থেকে তৈরি হয়:

  • আখের রস এবং বি-হেভি মোলাসেস (B-heavy molasses)
  • নষ্ট বা উদ্বৃত্ত খাদ্যশস্য এবং ভুট্টা

দেশের শীর্ষস্থানীয় চিনি এবং বায়ো-এনার্জি সংস্থাগুলি এই ইথানল তৈরি করে এবং রাষ্ট্রায়ত্ত তেল বিপণন সংস্থাগুলিকে (যেমন IOCL, HPCL, BPCL) সরবরাহ করে। ভারতের প্রধান ইথানল প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলি হলো:

  • বলরামপুর চিনি মিলস লিমিটেড (Balrampur Chini Mills Ltd): উত্তরপ্রদেশে অবস্থিত ভারতের অন্যতম বৃহত্তম ইথানল এবং চিনি উৎপাদনকারী সংস্থা।
  • ই.আই.ডি.-প্যারি ইন্ডিয়া লিমিটেড (E.I.D.-Parry India Ltd): দক্ষিণ ভারতে (তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ এবং কর্ণাটক) বৃহৎ পরিসরে ডিস্টিলারি পরিচালনাকারী শীর্ষস্থানীয় সংস্থা।
  • ধামপুর বায়ো অর্গানিকস লিমিটেড (Dhampur Bio Organics): আখ প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে আধুনিক ও পরিবেশবান্ধব বায়ো-ইথানল তৈরির অন্যতম প্রধান নাম।

দাম, উপাদান এবং প্রাপ্যতা

  • লঞ্চের দাম: দিল্লিতে প্রতি লিটার ₹৮২.১২, যা সাধারণ E20 পেট্রোলের চেয়ে পাক্কা ₹২০ সস্তা
  • উপাদান (Composition): এতে ৮০% থেকে ৮৫% বায়ো-ইথানল এবং ১৫% থেকে ২০% প্রচলিত পেট্রোল মিশ্রিত থাকে।
  • প্রাপ্যতা: প্রাথমিক পর্যায়ে দিল্লি-এনসিআর এবং মহারাষ্ট্রের ৪৮টি নির্বাচিত পেট্রোল পাম্পে এর বিক্রি শুরু হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে ৫০০টি আউটলেট এবং ২০২৭ সালের মধ্যে ৫,০০০টি আউটলেটে এটি উপলব্ধ করা।

E20 পেট্রোল বনাম E85: তুলনামূলক পার্থক্য

বৈশিষ্ট্যসাধারণ E20 পেট্রোলনতুন E85 জ্বালানি
ইথানলের পরিমাণ২০%৮৫%
অকটেন রেটিংকম (~91 RON)অত্যন্ত উচ্চ (~108 RON)
দামসাধারণ বাজার দরপ্রতি লিটারে ₹২০ সস্তা
মাইলেজ (গড়)সাধারণ স্ট্যান্ডার্ড২৫% থেকে ৩৫% পর্যন্ত বড় পতন

গাড়ির ক্ষেত্রে অসুবিধা এবং সতর্কবার্তা

পাম্পে কম দাম দেখে আকৃষ্ট হলেও, সাধারণ গাড়ি বা বাইক মালিকদের জন্য এর কিছু মারাত্মক প্রযুক্তিগত অসুবিধা রয়েছে:

  • ইঞ্জিন নষ্ট হওয়ার কড়া সতর্কবার্তা: এই জ্বালানি আপনার সাধারণ পেট্রোল গাড়ি বা বর্তমানের E20 বাইকে ভুল করেও ব্যবহার করবেন না। এটি করলে গাড়ির ফুয়েল সিস্টেম এবং ইঞ্জিন সম্পূর্ণ স্থায়ীভাবে নষ্ট হয়ে যাবে। এটি কেবলমাত্র বিশেষভাবে তৈরি ফ্লেক্স-ফুয়েল যানবাহনের (FFV) জন্য নিরাপদ।
  • মাইলেজে ব্যাপক হ্রাস: ইথানলের শক্তি ঘনত্ব (Energy Density) পেট্রোলের চেয়ে কম। এর ফলে E85 জ্বালানিতে গাড়ি চালালে মাইলেজ ২৫% থেকে ৩৫% পর্যন্ত কমে যাবে। অর্থাৎ, দাম সস্তা হলেও আপনাকে ঘন ঘন জ্বালানি ভরতে হবে।
  • মরিচা এবং রবার গলে যাওয়ার ঝুঁকি: ইথানল বাতাস থেকে আর্দ্রতা (জল) শোষণ করে। সাধারণ গাড়িতে এটি ব্যবহার করলে লোহার ফুয়েল ট্যাংকে দ্রুত মরিচা ধরে যায় এবং ভেতরের রবার সিল ও ফুয়েল পাইপ গলিয়ে দেয়।
  • কোল্ড স্টার্টের সমস্যা: শীতকালে বা ভারী বর্ষার সময় ইথানল সহজে বাষ্পীভূত হতে চায় না। এর ফলে ঠান্ডা আবহাওয়ায় সকালে গাড়ি স্টার্ট করতে বেশি সময় লাগতে পারে বা ইঞ্জিন কাঁপতে পারে।
  • গাড়ির অতিরিক্ত দাম: মরিচারোধক দামি পার্টস এবং বিশেষ ইথানল সেন্সর ব্যবহারের কারণে ফ্লেক্স-ফুয়েল বাইক সাধারণ বাইকের চেয়ে প্রায় ₹৬,০০০ এবং কার বা চারচাকা গাড়ি ₹৫০,০০০ থেকে ₹১,০০,০০০ পর্যন্ত বেশি দামি হয়। বর্তমানে বাজারে হিরো স্প্লেন্ডার+ ফ্লেক্স ফুয়েল, হিরো এইচএফ ডিলাক্স ফ্লেক্স ফুয়েল এবং সুজুকি গিক্সার এসএফ ২৫০ এফএফভি-র মতো হাতে গোনা কয়েকটি মডেল উপলব্ধ রয়েছে।
Share This Article
Exit mobile version