দ্য গ্রেট বিহার নেটওয়ার্কিং হাইস্ট: বক্সারে কোনো প্রমাণ না রেখেই কীভাবে উধাও হলো ১৩২ ফুট উঁচু মোবাইল টাওয়ার

Bihar Mobile Tower Theft
Bihar Mobile Tower Theft (PC: Social Media Sites)

বিহারে পরিকাঠামো সংকট

বক্সার / পাটনা — এমন এক অদ্ভুত অপরাধের ঘটনা সামনে এসেছে যা কোনো স্থানীয় থানার রেকর্ডের চেয়ে হলিউড সিনেমার চিত্রনাট্যের মতোই বেশি শোনায়। বিহারের চোরেরা এবার পরিকাঠামো চুরির এক অবিশ্বাস্য কাণ্ড ঘটিয়েছে। বক্সার জেলার ডুমরাও শহরের একটি জনবহুল আবাসিক এলাকা থেকে ৪০ মিটার (১৩২ ফুট) উঁচু একটি আস্ত মোবাইল টেলিকম টাওয়ার, সাথে একটি ভারী ১৫ কেভিএ (KVA) ডিজেল জেনারেটর এবং হাজার হাজার টাকার বিশেষ যন্ত্রপাতি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে।

এই চুরির দুঃসাহস দেখে স্থানীয় বাসিন্দা এবং পুলিশ প্রশাসন—উভয় পক্ষই হতবাক। এই ঘটনাটি বিহারে ঘটা অবিশ্বাস্য এবং বড় মাপের পরিকাঠামো চুরির তালিকায় একটি নতুন নজির স্থাপন করল।

চুরির হদিস: ফাঁকা জমি

দুর্ঘটনার বিবরণ

এই চমকপ্রদ চুরির বিষয়টি তখন প্রকাশ্যে আসে যখন জিটিএল ইনফ্রাস্ট্রাকচার লিমিটেড (GTL Infrastructure Limited)-এর একটি পরিদর্শক দল নিয়মিত পরীক্ষার জন্য ডুমরাও-এর ১৮ নম্বর ওয়ার্ডে পৌঁছায়। ২০১০ সালে স্থাপিত এই টাওয়ারটি প্রযুক্তিগত কারণে গত কয়েক বছর ধরে বন্ধ ছিল এবং কোম্পানিটি তা পুনরায় চালু করার জন্য সাইটে এসেছিল।

সেখানে গিয়ে আকাশছোঁয়া বিশাল ইস্পাত কাঠামোর পরিবর্তে কর্মকর্তারা শুধুমাত্র একটি সম্পূর্ণ খালি জমি দেখতে পান। এই দৃশ্য দেখে স্তব্ধ কোম্পানির জমি ও পরিচালনা কর্মকর্তা বৈজনাথ ওঝা অবিলম্বে ডুমরাও থানায় গিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেন।

কয়েক দিন ধরে চলা চুরির রহস্যভেদ

চুরির কৌশলের বিবরণ

সাধারণত দেশের বিভিন্ন প্রান্তে তামার তার, ব্যাকআপ ব্যাটারি বা ইলেকট্রনিক চিপ চুরির ঘটনা ঘটলেও, একটি আস্ত টেলিকম টাওয়ার চুরি করার জন্য সম্পূর্ণ অন্য স্তরের অপরাধমূলক পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়।

তদন্তকারী এবং স্থানীয় পুলিশ এই চুরির বেশ কয়েকটি চমকপ্রদ দিক চিহ্নিত করেছে:

  • ভারী যন্ত্রপাতির ব্যবহার: আশেপাশের বাড়িগুলোর ওপর না ফেলে ১৩২ ফুট উঁচু ইস্পাত কাঠামোটি নিরাপদে কেটে সরিয়ে নেওয়ার জন্য ইন্ডাস্ট্রিয়াল-গ্রেড গ্যাস কাটার, ক্রেন এবং ভারী জেসিবি মেশিনের প্রয়োজন ছিল।
  • প্রযুক্তিগত গ্যাং-এর হাত: পুলিশের ধারণা, এই কাজের পেছনে প্রযুক্তিগত জ্ঞানসম্পন্ন একটি অত্যন্ত সুসংগঠিত দল জড়িত ছিল, যারা টানা কয়েক দিন ধরে সেখানে কাজ পরিচালনা করেছে।
  • সবার চোখের সামনে চুরি: একটি ব্যস্ত আবাসিক এলাকার মাঝখানে এবং স্থানীয় থানার খুব কাছে অবস্থিত হওয়া সত্ত্বেও, এই দল কোনো রকম সন্দেহ না জাগিয়ে টন টন লোহা এবং একটি বিশাল জেনারেটর পাচার করতে সক্ষম হয়।

ভাড়া নিয়ে বিরোধের নতুন মোড়

তদন্তে নতুন তথ্য

দিনের আলোয় কীভাবে একটি আস্ত টাওয়ার উধাও হয়ে গেল তা খতিয়ে দেখতে গিয়ে পুলিশ একটি জটিল দেওয়ানি (Civil) বিরোধের সন্ধান পায়। এই টাওয়ারটি হরিনাথ যাদব নামের এক স্থানীয় বাসিন্দার জমিতে অবস্থিত ছিল।

যাদব কর্মকর্তাদের জানান যে জিটিএল ইনফ্রাস্ট্রাকচার-এর সাথে তার ১২ বছরের লিজ চুক্তি ২০২২ সালে শেষ হয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন যে কোম্পানিটি ২০১৭ সাল থেকেই তাকে ভাড়া দেওয়া সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিয়েছিল। বন্ধ যন্ত্রপাতি সরিয়ে নেওয়া এবং বকেয়া টাকা মেটানোর দাবি জানিয়ে কোম্পানিকে চারটি আইনি নোটিশ পাঠানো হলেও যাদব কোনো জবাব পাননি।

যদিও যাদব এই চুরির বিষয়ে কোনো কিছু জানার কথা সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন, তবে স্থানীয় পুলিশ খতিয়ে দেখছে যে এই “হাইস্ট” আদতে ভাড়ার বিরোধের জেরে ঘটেছে নাকি কোনো বহিরাগত স্ক্র্যাপ মাফিয়া এই পরিত্যক্ত জায়গার সুযোগ নিয়ে চুরিটি করেছে।

পুলিশি তৎপরতা: প্রথম বড় সাফল্য

প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া

এফআইআর (FIR) দায়ের করার পর, ডুমরাও-এর মহকুমা পুলিশ কর্মকর্তা (SDPO) পোলাস্ত কুমারের নেতৃত্বে বিহার পুলিশ দ্রুত তদন্ত শুরু করে।

পুলিশ ইতিমধ্যেই এই মামলায় প্রথম বড় সাফল্য পেয়েছে। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে চালানো এক অভিযানে উধাও হওয়া ১৫ কেভিএ ডিজেল জেনারেটরটি সফলভাবে উদ্ধার করা হয়েছে। কর্মকর্তারা এই চুরির পেছনে থাকা দুজন মূল সন্দেহভাজনকে চিহ্নিত করেছেন; এদের মধ্যে একজনকে হেফাজতে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে, আর অন্য সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করতে এবং টাওয়ারের কেটে নেওয়া লোহার অংশগুলো উদ্ধার করতে লাগাতার অভিযান চালানো হচ্ছে।

দুঃসাহসিক চুরির পুরানো রেকর্ড

আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি

স্থানীয় মানুষের কাছে এই ঘটনাটি বিহারের পুরোনো কিছু চুরির স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে। বিহারে বড় বড় ইঞ্জিনিয়ারিং কাঠামোকে লক্ষ্য বানানোর জন্য অপরাধী চক্রগুলোর এক বিশেষ ইতিহাস রয়েছে:

  • ২০২২ সালে, সেচ দপ্তরের কর্মকর্তা সেজে একদল চোর গ্যাস কাটার এবং জেসিবি ব্যবহার করে রোহতাস জেলায় তিন দিনের মধ্যে একটি ৬০ ফুট লম্বা এবং ৫০০ টন ওজনের ঐতিহাসিক লোহার ব্রিজ সম্পূর্ণ কেটে চুরি করে নিয়ে যায়।
  • একই বছরের শেষের দিকে, বেগুনসরাইয়ের একটি রেল ইয়ার্ড থেকে চোরেরা একটি আস্ত পুরোনো রেল ইঞ্জিন পার্টস বাই পার্টস খুলে গায়েব করে দিয়েছিল।

একটি ব্রিজ, একটি রেল ইঞ্জিন এবং এবার ১৩২ ফুট উঁচু মোবাইল টাওয়ারের চুরির পর, বিহারের চোরেরা আবার প্রমাণ করল যে যদি কোনো জিনিসকে নাট-বল্টু দিয়ে আলাদা করা যায়, তবে তা চুরিও করা সম্ভব। পুলিশ ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে।

Share This Article
Exit mobile version