চারধাম যাত্রা 2026: চারধামে ৩১ লাখেরও বেশি পুণ্যার্থীর ঢল, ৪৯ দিনে ১৬৫ জনের মৃত্যুতে বাড়ছে উদ্বেগ

Char Dham Yatra 2026
Char Dham Yatra 2026 (PC: Social Media Sites)

উত্তরাখণ্ডের চারধাম যাত্রায় এবার রেকর্ড ভিড়। তবে দুর্গম পাহাড়ি পথ ও হৃদরোগের কারণে গত ৪৯ দিনে ১৬৫ জন ভক্তের মৃত্যুর খবর মিলেছে, যা নিয়ে চিন্তিত প্রশাসন।

উত্তরাখণ্ড / দেরাদুন — উত্তরাখণ্ডের বিশ্বখ্যাত চারধাম যাত্রায় এই মরসুমে পুণ্যার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে, তবে এই ঐতিহাসিক জনসমাগমের মাঝেই দুর্গম পাহাড়ি রুটে তীর্থযাত্রীদের মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা প্রশাসনকে বড় উদ্বেগের মুখে ফেলেছে।

স্টেট ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টারের (State Emergency Operation Centre) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ১৯ এপ্রিল গঙ্গোত্রী ও যমুনোত্রীর পোর্টাল খোলার মাধ্যমে চারধাম যাত্রা শুরু হওয়ার পর মাত্র ৪৯ দিনের মধ্যে ১৬৫ জন ভক্তের মৃত্যু হয়েছে। চিকিৎসকদের মতে, উচ্চতাজনিত সমস্যা এবং মূলত হৃদরোগে আক্রান্ত (কার্ডিয়াক অ্যারেস্ট) হয়েই এই মৃত্যুর ঘটনাগুলি ঘটেছে। এই পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতিদিন গড়ে তিনজনেরও বেশি পুণ্যার্থী প্রাণ হারাচ্ছেন।

পুণ্যার্থীদের ভিড়ে ভাঙল পূর্বের সব রেকর্ড

স্বাস্থ্য সংক্রান্ত এত ঝুঁকির পরেও চারধামে ভক্তদের আগমন একটুও কমেনি। শনিবার পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ৩১,৬৫,৭৪৬ জন তীর্থযাত্রী চার হিমালয় ধাম এবং হেমকুণ্ড সাহেব দর্শন করেছেন, যা ইঙ্গিত করে যে এবারের যাত্রা অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।

চলতি বছর উত্তরাখণ্ড রাজ্য সরকার পুণ্যার্থীদের সংখ্যার ওপর কোনো কঠোর বিধিনিষেধ বা দৈনিক সীমা আরোপ করেনি, যার ফলে দর্শনার্থীদের সংখ্যায় এই বিপুল জোয়ার এসেছে। এই মরসুমে এখন পর্যন্ত প্রায় ৪৭ লক্ষ পুণ্যার্থী চারধাম যাত্রার জন্য নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছেন।

শনিবার পর্যন্ত প্রধান ধামগুলিতে পৌঁছানো ভক্তদের সংখ্যা:

  • কেদারনাথ: ১১,২৩,০১৩ জন তীর্থযাত্রী
  • বদ্রীনাথ: ৯,২৮,৯১৯ জন তীর্থযাত্রী
  • এছাড়া গঙ্গোত্রী এবং যমুনোত্রী রুটেও প্রতিনিয়ত ব্যাপক ভিড় লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
কেদারনাথ রুটেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি

অতিরিক্ত উচ্চতা, অক্সিজেনের ঘাটতি এবং চরম প্রতিকূল আবহাওয়ার কারণে আগে থেকে অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য এই পাহাড়ি পথ অত্যন্ত বিপজ্জনক প্রমাণিত হচ্ছে। একজন সিনিয়র কর্মকর্তা জানিয়েছেন, “এবার পুণ্যার্থীদের আসার সংখ্যা অস্বাভাবিক রকমের বেশি। রুটের বিভিন্ন স্থানে মেডিকেল টিম মোতায়েন করা হয়েছে, তবে তীব্র উচ্চতা, খামখেয়ালি আবহাওয়া এবং আগে থেকে থাকা শারীরিক অসুস্থতা এখনও বড় ঝুঁকির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে”।

দুর্গম ও খাড়াই চড়াইয়ের কারণে কেদারনাথ রুটটি সবচেয়ে প্রাণঘাতী প্রমাণিত হয়েছে। মোট ১৬৫টি মৃত্যুর রুট-ভিত্তিক হিসাব নিচে দেওয়া হলো:

  • কেদারনাথ রুট: ৮০ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু
  • বদ্রীনাথ রুট: ৪৮ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু
  • যমুনোত্রী রুট: ২১ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু
  • গঙ্গোত্রী রুট: ১৬ জন তীর্থযাত্রীর মৃত্যু
বর্ষার পূর্বাভাস ও স্বাস্থ্য দপ্তরের জরুরি নির্দেশিকা

আগামী ২১ জুনের মধ্যে উত্তরাখণ্ডে বর্ষা প্রবেশের সম্ভাবনা রয়েছে, তার আগেই এই বিপুল পরিমাণ মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে। সাধারণত, ধস, রাস্তাঘাট বন্ধ হওয়া এবং দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার কারণে বর্ষাকালে পুণ্যার্থীদের সংখ্যা কমে যায়, তবে প্রশাসনের আশা যে বর্ষা কমে যাওয়ার পর এই যাত্রা আবার পূর্ণ গতি ফিরে পাবে। আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত এই যাত্রা চলার কথা রয়েছে, অর্থাৎ এখনও প্রায় পাঁচ মাস সময় বাকি।

যেহেতু চারধাম যাত্রা উত্তরাখণ্ডের ধর্মীয় পর্যটন অর্থনীতির মূল ভিত্তি এবং এর সাথে পরিবহন, হোটেল, ঘোড়া-খচ্চর চালক ও স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সাথে যুক্ত লক্ষাধিক পরিবারের রুজি-রুটি জড়িয়ে রয়েছে, তাই নিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।

স্বাস্থ্য আধিকারিকরা প্রবীণ তীর্থযাত্রী এবং বিশেষ করে যাদের হার্ট, শ্বাসকষ্ট বা রক্তচাপের (BP) সমস্যা রয়েছে, তাদের যাত্রা শুরু করার আগে বাধ্যতামূলকভাবে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছেন। কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছেন, “পুণ্যার্থীরা কোনোভাবেই বুক ব্যাথা, শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অতিরিক্ত ক্লান্তির মতো উপসর্গগুলিকে অবহেলা করবেন না। এমন কিছু অনুভব করলেই অবিলম্বে নিকটবর্তী সরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে যোগাযোগ করুন”।

Share This Article
Exit mobile version