নয়াদিল্লি — ভারতের মূল ভূখণ্ড থেকে $১,২০০$ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে, কিন্তু বিশ্ব বাণিজ্যের অন্যতম ব্যস্ত সামুদ্রিক পথের মুখে অবস্থিত গ্রেট নিকোবার দ্বীপ। এটি একটি প্রত্যন্ত পরিবেশগত স্বর্গ থেকে রূপান্তরিত হয়ে এখন চীনের নৌবাহিনীর সম্প্রসারণবাদকে রুখতে নতুন দিল্লির সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা নীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভে পরিণত হচ্ছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক এবং নীতি আয়োগের উদ্যোগে পরিচালিত ৮১,০০০ কোটি টাকার ‘গ্রেট নিকোবার উন্নয়ন প্রকল্প’-এর হাত ধরে এই দ্বীপটিকে সামরিক ও বেসামরিকভাবে আপগ্রেড করা হচ্ছে। পশ্চিমা এবং এশিয়ার গোয়েন্দা বিশ্লেষকরা ইতিমধ্যেই এই অঞ্চলটিকে ভারতের একটি “অবিনাশী যুদ্ধজাহাজ” বা “আনসিঙ্কেবল এয়ারক্রাফট ক্যারিয়ার” (Unsinkable Aircraft Carrier) হিসেবে অভিহিত করতে শুরু করেছেন।
মালাক্কা প্রণালীর (Strait of Malacca) ওপর ভারতের ওয়াচটাওয়ার
গ্রেট निकोবারের এই দ্রুত উন্নয়নের মূল কারণ হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। এই দ্বীপটি সরাসরি সিক্স ডিগ্রি চ্যানেল (Six Degree Channel)-এর পাশে অবস্থিত, যা মালাক্কা প্রণালীর পশ্চিম প্রবেশদ্বার থেকে মাত্র $১৩০$ থেকে $১৫০$ কিলোমিটার দূরে।
মালাক্কা প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং ব্যস্ত সামুদ্রিক পথগুলির একটি, যেখান দিয়ে প্রতি বছর প্রায় $৯৪,০০০$ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল করে। নতুন দিল্লির জন্য গ্রেট নিকোবারকে একটি অত্যাধুনিক সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করা মানে চীনের সেই দুর্বল জায়গায় আঘাত করা, ভূ-রাজনীতিতে যাকে চীনের “মালাক্কা দ্বিধা” (Malacca Dilemma) বলা হয়।
চীনের মালাক্কা দ্বিধা: চীনের মোট অপরিশোধিত তেল আমদানির প্রায় ৭৫% এবং সামগ্রিক বৈশ্বিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৩০% এই সংকীর্ণ ২.৮ কিলোমিটার চওড়া মালাক্কা প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হয়। কোনো আন্তর্জাতিক সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হলে, যে দেশের নিয়ন্ত্রণে এই প্রণালীর মুখ থাকবে, তারা সহজেই চীনের অর্থনৈতিক লাইফলাইন বা জীবনরেখা বন্ধ করে দিতে পারে।
এখানে বিদ্যমান সামরিক বিমানঘাঁটি ‘আইএনএস বাজ’ (INS Baaz)-এর পাশাপাশি নৌ-সুবিধাগুলি আরও উন্নত করার মাধ্যমে, ভারত তার আন্দামান ও নিকোবার ট্রাই-সার্ভিসেস কমান্ডকে ২৪ ঘণ্টা জলপথের ওপরে ও নিচে নজরদারির জন্য প্রস্তুত করছে। এর ফলে ভারত মহাসাগরে প্রবেশকারী চীনা যুদ্ধজাহাজ ও সাবমেরিনগুলির ওপর সরাসরি নজর রাখার ক্ষমতা পাবে নতুন দিল্লি।
মেগা-প্রজেক্টের চার মূল স্তম্ভ
আন্দামান ও নিকোবার দ্বীপপুঞ্জ সমন্বিত উন্নয়ন কর্পোরেশন (ANIIDCO) দ্বারা বাস্তবায়িত এই মাস্টার প্ল্যানটি দ্বীপের প্রায় $১৬৬$ বর্গকিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। এটিকে একটি দ্বৈত-ব্যবহারকারী (সামরিক ও বেসামরিক) ইকোসিস্টেম হিসেবে ডিজাইন করা হয়েছে, যার ৪টি প্রধান অংশ রয়েছে:
- গালাথিয়া বে ট্রান্সশিপমেন্ট টার্মিনাল: $১৪.২$ থেকে $১৬$ মিলিয়ন টিইইউ (TEUs) ক্ষমতাসম্পন্ন একটি গভীর আন্তর্জাতিক কনটেইনার বন্দর। এর গভীরতা $২০$ মিটারের বেশি হওয়ায় এটি বিশ্বের বড় বড় বাণিজ্যিক জাহাজকে আকৃষ্ট করবে এবং কলম্বো ও সিঙ্গাপুরের মতো বিদেশী বন্দরগুলির ওপর ভারতের নির্ভরতা কমাবে।
- গ্রিনফিল্ড আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর: এটি বাণিজ্যিক পর্যটন এবং দ্রুত সামরিক বিমান মোতায়েন — উভয় কাজের জন্যই উপযুক্ত হবে, যা প্রতি ঘণ্টায় $৪,০০০$ যাত্রী সামলাতে পারবে।
- গ্যাস ও সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র: দ্বীপের নতুন পরিকাঠামোয় সার্বক্ষণিক বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য একটি $৪৫০\text{ MVA}$ সমন্বিত পরিবেশ-বান্ধব বিদ্যুৎ কেন্দ্র।
- স্মার্ট ডিফেন্স টাউনশিপ: সামরিক কর্মী, লজিস্টিক বিশেষজ্ঞ এবং সহায়তাকারী কর্মচারীদের আবাসনের জন্য $১৬,০০০$ হেক্টর এলাকা জুড়ে একটি আধুনিক উপকূলীয় শহর।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ সংরক্ষণ: একটি বড় বিতর্ক
জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে এই প্রকল্পের ভূ-রাজনৈতিক প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম হলেও, দ্বীপের পরিবেশগত ক্ষতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। ন্যাশনাল গ্রিন ট্রাইব্যুনাল (NGT) দেশের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে এই প্রকল্পের পরিবেশগত ছাড়পত্র বহাল রেখেছে। তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করেছেন যে, এর জন্য প্রকৃতিকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে।
কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রকের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিকাঠামো তৈরির জন্য প্রায় $১৩০$ বর্গকিলোমিটার প্রাচীন ক্রান্তীয় চিরহরিৎ অরণ্য (rainforest) ধ্বংস করতে হবে, যার জন্য প্রায় ৯.৬৪ লাখ (৯৬৪,০০০) গাছ কাটা পড়বে।
জীববিজ্ঞানীরা সতর্ক করেছেন যে, গালাথিয়া বে-তে নির্মাণের ফলে বিলুপ্তপ্রায় ‘জায়ান্ট লেদারব্যাক’ সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রধান ডিম পাড়ার বাসস্থান ধ্বংসের মুখে পড়বে। এছাড়াও, এই প্রকল্প অঞ্চলটি ‘শম্পেন’ (Shompen) এবং ‘নিকোবারী’ উপজাতিদের আদিম বাসভূমির সীমানা স্পর্শ করে, যারা আইনগতভাবে সংরক্ষিত অত্যন্ত সংবেদনশীল আদিবাসী গোষ্ঠী (PVTGs)।
এই উদ্বেগ দূর করতে ভারত সরকার ‘শম্পেন পলিসি ২০১৫’ কঠোরভাবে মেনে চলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যাতে উপজাতিদের স্থানচ্যুত হতে না হয়। পাশাপাশি, সামুদ্রিক প্রবাল প্রাচীর (coral reef) অন্য নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং পরিবেশগত ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পাশের লিটল নিকোবার দ্বীপে বিকল্প বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।

