খনির গ্রাসে ঝাড়খণ্ডের আদিবাসী ইতিহাস, চোকাহাতুর জন্য ইউনেস্কো স্বীকৃতির দাবি

Megaliths Of Chokahatu, Jharkhand
Megaliths Of Chokahatu, Jharkhand (PC: Social Media Sites)

হাজারিবাগ / রাঁচি: ঝাড়খণ্ডের কয়লা খনিগুলির আগ্রাসনে নিঃশব্দে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে ভারতের প্রাচীন আদিবাসী সভ্যতার ইতিহাস। হাজারিবাগের বাসিন্দা তথা বিশিষ্ট গবেষক ও লেখক শুভাশিস দাস গত তিন দশক ধরে এই রাজ্যের ‘মেগালিথ’ (প্রাগৈতিহাসিক যুগের বিশাল পাথরের স্মৃতিস্তম্ভ) সনাক্তকরণ এবং তা বাঁচানোর লড়াই লড়ে যাচ্ছেন। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। সরকারি উদাসীনতা এবং লাগামহীন খনি প্রকল্পের জেরে এই প্রাচীন প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলি চিরতরে মুছে যাওয়ার মুখে।

চোকাহাতু-র বাঁচানোর লড়াই

রাঁচি জেলার বুন্ডু এলাকায় অবস্থিত চোকাহাতু মেগালিথ সাইটটি এখন এই লড়াইয়ের মূল কেন্দ্র। এটি মুন্ডা উপজাতির একটি প্রাচীন কবরস্থান, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে আজ অব্দি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। ২০০৯ সালে প্রকাশিত তাঁর ‘সেক্রেড স্টোনস ইন ইন্ডিয়ান সিভিলাইজেশন’ গ্রন্থে শুভাশিসবাবু এই চোকাহাতুর ঐতিহাসিক গুরুত্ব তুলে ধরেছিলেন। গত ১০ বছর ধরে তিনি এই সাইটটিকে ইউনেস্কোর (UNESCO) ‘ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইট’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য একটি অনলাইন ক্যাম্পেন চালাচ্ছেন। অথচ প্রশাসনিক স্তরে কোনো নজরদারি না থাকায় বর্তমানে এই ঐতিহাসিক স্থানটি চারণভূমিতে পরিণত হয়েছে।

পাকরি বারওয়াডি: কয়লা খনির বলি খগোলবিজ্ঞান

গবেষকদের চোকাহাতু নিয়ে এত উদ্বেগের কারণ হলো, ঝাড়খণ্ডের অন্য একটি বিখ্যাত মেগালিথ সাইট পাকরি বারওয়াডি ইতিমধ্যেই ধ্বংসের দোরগোড়ায়। হাজারিবাগের এই স্থানটি প্রাচীনকালে ‘ইকুইনক্স’ বা দিন-রাত্রি সমান হওয়ার মহাজাগতিক ঘটনা পর্যবেক্ষণের জন্য ব্যবহৃত হতো।

২০১৬ সালে এই এলাকায় ন্যাশনাল থার্মাল পাওয়ার কর্পোরেশন (NTPC)-র ৩,০০০ হেক্টরেরও বেশি বড় একটি ওপেন-কাস্ট কয়লা খনি চালু হয়। বছরে ১৫ মিলিয়ন টন কয়লা উত্তোলনের ক্ষমতাসম্পন্ন এই খনিটি মেগালিথ সাইটটির মাত্র ৫ কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। ২০১৭-১৮ সালে স্থানীয় আদিবাসী মানুষজন খনি প্রকল্পের বিরুদ্ধে তীব্র আন্দোলন করলেও শেষরক্ষা হয়নি। ডিনামাইট ব্লাস্টিং ও ভারী গাড়ির দাপটে এই প্রাচীন ঐতিহ্য আজ প্রায় বিলুপ্ত।

হারিয়ে যাওয়া স্মৃতির দলিল

শুভাশিসবাবু অত্যন্ত আবেগপ্রবণ হয়ে জানান, বছর বারো আগে হাজারিবাগের কাছে তাঁর আবিষ্কৃত ‘কাটিয়া মুরওয়ে’ সাইটটি যখন তিনি ইংল্যান্ড থেকে আসা তাঁর বন্ধুদের দেখাতে নিয়ে যান, তখন দেখেন সেখানকার প্রাচীন পাথরগুলি সম্পূর্ণ উধাও হয়ে গেছে। স্থানীয় স্তরে সেগুলি ভেঙে বাড়ি তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অনুমান। শুভাশিস দাস বর্তমানে তাঁর পঞ্চম তথা শেষ বইটির চূড়ান্ত সম্পাদনার কাজ করছেন, যা আগামী কয়েক মাসের মধ্যে প্রকাশিত হবে। ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে থাকা ঝাড়খণ্ডের মেগালিথ সংস্কৃতির এটিই সম্ভবত শেষ প্রামাণ্য ইতিহাস হতে চলেছে।

Share This Article
Exit mobile version