লোকতাক প্রোটোক্লাস্টার: মণিপুরি বিজ্ঞানী রোনাল্ডো লাইশরামের হাত ধরে মহাবিশ্বে অমর হলো ‘লোকতাক’

Indian Researcher Names Newly Discovered Galaxy Structure After Manipurs Loktak Lake
Indian Researcher Names Newly Discovered Galaxy Structure After Manipurs Loktak Lake (PC: Social Media Sites)

মহাকাশে গড়ে ওঠা ‘ছায়াপথের শহর’

আধুনিক জ্যোতির্বিজ্ঞানের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক ছুঁয়ে ফেললেন মণিপুরি জ্যোতির্পদার্থবিজ্ঞানী ড. রোনাল্ডো লাইশরাম। তাঁর নেতৃত্বে এক আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানী দল মহাবিশ্বের গভীরতম প্রান্তে প্রায় ১২.৬ বিলিয়ন (১,২৬০ কোটি) বছর প্রাচীন একটি বিশাল গ্যালাক্সি বা ছায়াপথ কাঠামোর সন্ধান পেয়েছেন। এই আদিম ছায়াপথ পুঞ্জটির নাম রাখা হয়েছে মণিপুরের বিখ্যাত হ্রদের নামানুসারে—‘লোকতাক প্রোটোক্লাস্টার’ (Loktak Protocluster)। বিশ্ববিখ্যাত বিজ্ঞান পত্রিকা ‘দ্য অ্যাস্ট্রোফিজিক্যাল জার্নাল লেটার্স’-এ এই গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়েছে।

জ্যোতির্বিজ্ঞানের ভাষায় ‘প্রোটোক্লাস্টার’ হলো মহাকর্ষ বলের অধীনে তৈরি হতে থাকা একটি নতুন গ্যালাক্সি ক্লাস্টার, যাকে সহজ ভাষায় “ছায়াপথগুলির শহর” বলা চলে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, এই কাঠামোটির অস্তিত্ব তখন ছিল যখন সমগ্র মহাবিশ্বের বয়স ছিল বর্তমান বয়সের তুলনায় অত্যন্ত কম—মাত্র ১.২ বিলিয়ন (১২০ কোটি) বছর।

লোকতাক হ্রদের সাথে মহাজাগতিক মিল

বর্তমানে টোকিওর ন্যাশনাল অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল অবজারভেটরি অফ জাপান (NAOJ)-এর বিজ্ঞানী ড. রোনাল্ডো লাইশরাম জানিয়েছেন, এই আবিষ্কারের মাধ্যমে তিনি নিজের জন্মভূমিকে আন্তর্জাতিক স্তরে এক অনন্য সম্মান উৎসর্গ করতে চেয়েছেন। মণিপুরের লোকতাক হ্রদের সাথে এই মহাজাগতিক কাঠামোর এক অপূর্ব গঠনগত মিল রয়েছে:

  • মণিপুরের লোকতাক হ্রদ: এই হ্রদটি তার বুকে ভেসে থাকা জলজ উদ্ভিদের দ্বীপ ‘ফুমডি’ (phumdis)-র জন্য বিখ্যাত, যা একটি একক জলাধারের মধ্যে বিচ্ছিন্ন অথচ সংযুক্ত অবস্থায় থাকে।
  • মহাজাগতিক লোকতাক প্রোটোক্লাস্টার: এই নতুন আবিষ্কৃত মহাজাগতিক কাঠামোটিতেও চারটি ভিন্ন ছায়াপথ কেন্দ্র (Galaxy Concentrations) রয়েছে, যা একটি একক মহাজাগতিক মাধ্যাকর্ষণ ব্যবস্থার মাধ্যমে একে অপরের সাথে যুক্ত হয়ে বিবর্তিত হচ্ছে।

ড. রোনাল্ডো বলেন, “লোকতাক হ্রদ মণিপুরের পরিচয়ের সাথে গভীরভাবে জড়িয়ে। এই আবিষ্কারের সাথে লোকতাকের নাম জুড়ে দিয়ে আমি আমাদের বাড়ীকে মহাবিশ্বের অনন্ত কাহিনীর সাথে যুক্ত করলাম।”

জেমস ওয়েব টেলিস্কোপের যৌথ ম্যাজিক

এই সুদূরবর্তী প্রাচীন কাঠামোটি পর্যবেক্ষণ করতে গবেষকরা সুবারু টেলিস্কোপ (Subaru Telescope) এবং জেমস ওয়েব স্পেস टेलিস্কোপ (JWST)-এর শক্তিশালী ডেটা ব্যবহার করেছেন। এই গবেষণা থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে, আদি মহাবিশ্বের ঘন বা জনবহুল অঞ্চলে থাকা ছায়াপথগুলি তুলনামূলক ফাঁকা অঞ্চলের ছায়াপথগুলির থেকে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছিল। অর্থাৎ, একটি গ্যালাক্সি কীভাবে বৃদ্ধি পাবে তা অনেকটাই নির্ভর করে তার আশেপাশের পরিবেশের ওপর।

খঙ্গাবোক থেকে টোকিও: এক অনুপ্রেরণামূলক যাত্রা

মণিপুরের থৌবাল জেলার খঙ্গাবোক গ্রামের সন্তান ড. রোনাল্ডোর মহাকাশ চর্চার শুরু খুব অল্প বয়সেই। মাত্র ১৮ বছর বয়সে তিনি একটি গ্রহাণু (Asteroid) আবিষ্কার করেছিলেন, যার জন্য ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি ড. এ. পি. জে. আব্দুল কালাম তাঁকে বিশেষভাবে সম্মানিত করেন। পরবর্তীতে জাপানের তোহোকু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ও পিএইচডি সম্পন্ন করে তিনি NAOJ-তে যোগ দেন। গবেষণার পাশাপাশি তিনি মণিপুর অ্যাস্ট্রোনমিক্যাল সোসাইটি-র প্রতিষ্ঠাতা সমন্বয়ক হিসেবে উত্তর-পূর্ব ভারতের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতা ছড়ানোর কাজ করে যাচ্ছেন।

মণিপুরের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী এন. বীরেন সিং সমাজমাধ্যমে ড. রোনাল্ডো লাইশরামকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছেন যে, মহাবিশ্বের ইতিহাসের পাতায় লোকতাক হ্রদের নাম খোদাই হওয়া সমগ্র মণিপুরবাসীর জন্য এক চরম গর্বের মুহূর্ত এবং এটি আগামী প্রজন্মকে বিজ্ঞানের গবেষণায় উদ্বুদ্ধ করবে।

Share This Article
Exit mobile version