মণিপুরের কাংপোকপিতে লোইবল হামলায় নিহত কুকি-জো গ্রামবাসীদের স্মরণে ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কফিন মিছিল। জেলা জুড়ে সম্পূর্ণ ধর্মঘটের মধ্যে সম্পন্ন হলো শেষকৃত্য।
কাংপোকপি / ইম্ফল — মণিপুরের কাংপোকপি জেলায় শনিবার সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল স্বাভাবিক জনজীবন। সম্প্রতি লোইবল গ্রামে সশস্ত্র হামলায় নিহত তিন কুকি-জো গ্রামবাসীকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে এবং ন্যায়বিচারের দাবিতে আয়োজিত ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ এক বিশাল ‘কফিন র্যালি’-তে শামিল হলেন হাজার হাজার শোকার্ত মানুষ। গত শুক্রবার ভোরে লোইবল গ্রামে এক আকস্মিক হামলায় ওই তিন গ্রামবাসীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়।
নিহতদের মধ্যে এক তরুণ বিবাহিত দম্পতি এবং অন্য এক ব্যক্তি রয়েছেন যার স্ত্রী বর্তমানে সন্তানসম্ভবা। এই হত্যাকাণ্ডের জেরে রাজ্যের কুকি-জো অধ্যুষিত এলাকাগুলিতে তীব্র ক্ষোভ ও গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
শোক ও সংহতির দীর্ঘ মিছিল
কাংপোকপি জেলা হাসপাতাল থেকে কফিনগুলি নিয়ে পদযাত্রা শুরু হয়ে ৩৫ কিলোমিটার দূরে ফাইজাং-এর ‘শহীদ কবরস্থান’-এ (Martyrs’ Cemetery) গিয়ে শেষ হয়। এই আবেগঘন মিছিলে পা মেলান হাজার হাজার সাধারণ মানুষ। শেষকৃত্য অনুষ্ঠানে নিহতদের পরিবারের সদস্য এবং ‘কুকি ইনপি মণিপুর’ (KIM) এর সভাপতি সহ বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। শ্রদ্ধা ও সংহতির প্রতীক হিসেবে কফিনগুলির ওপর ঐতিহ্যবাহী শাল জড়িয়ে দেওয়া হয় এবং গান স্যালুটের মাধ্যমে তিন গ্রামবাসীকে সমাহিত করা হয়।
জননেতারা এই ৩৫ কিলোমিটার দীর্ঘ কফিন মিছিলকে দেশ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিবেকের কাছে একটি প্রতীকী আবেদন বলে বর্ণনা করেছেন।
ন্যায়বিচারের দাবি ও কেন্দ্রের হস্তক্ষেপের আর্জি
সমাপ্তি অনুষ্ঠানের ফাঁকে ‘কমিটি অন ট্রাইবাল ইউনিটি’ (CoTU)-র মুখপাত্র এনজি. লুন কিপগেন বলেন, বারবার উস্কানি ও সহিংসতার ঘটনা ঘটা সত্ত্বেও কুকি-জো সম্প্রদায় অত্যন্ত মর্যাদা, সংযম ও প্রার্থনার পথ বেছে নিয়েছে। তিনি স্পষ্ট জানিয়ে দেন, তাঁদের এই শান্তিপূর্ণ শেষকৃত্যের মিছিলকে যেন কেউ দুর্বলতা বলে ভুল না করে।
কিপগেনের মতে, গত কিছুদিনে এলাকায় একটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা রুখতে কেন্দ্র সরকারের অবিলম্বে হস্তক্ষেপ করা প্রয়োজন। তিনি সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা তুলে ধরেন:
- গত ১৩ মে কুকি-জো সম্প্রদায়ের তিনজন চার্চ নেতাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে হত্যা।
- খরাম ভাইপেই গ্রামে উপদ্রবীদের দ্বারা ব্যাপক আগুন লাগিয়ে দেওয়ার ঘটনা।
- লোইবল গ্রামে নির্দোষ নাগরিকদের ওপর ভোররাতের এই নতুন ও মারাত্মক হামলা।
ভারত সরকারের কাছে CoTU-র চার দফা দাবি
“আমাদের মানুষ শান্তি চায়, কিন্তু ন্যায়বিচার ছাড়া শান্তি টিকতে পারে না,” মন্তব্য করেন কিপগেন। প্রান্তিক ও সংবেদনশীল এলাকাগুলির নিরাপত্তা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে CoTU ভারত সরকারের কাছে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে চার দফা দাবি পেশ করেছে:
- সাম্প্রতিক হামলার সাথে জড়িত সশস্ত্র উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলির বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর ও সুনির্দিষ্ট ব্যবস্থা নিতে হবে।
- লোইবল হত্যাকাণ্ড এবং চার্চ নেতাদের খুনের সাথে জড়িত অপরাধীদের দ্রুত চিহ্নিত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে।
- সেনাপতি জেলায় জিম্মি করে রাখা কুকি-জো সম্প্রদায়ের ১৪ জন সাধারণ নাগরিককে অবিলম্বে এবং নিরাপদে উদ্ধার করতে হবে।
- প্রত্যন্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলিতে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষার্থে স্থায়ীভাবে অতিরিক্ত কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করতে হবে।

